কিউবায় আবারও জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। শুক্রবারের (২৫সেপ্টেম্বর) এই বিপর্যয়ে দেশটির লাখো মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। গত দুই বছরে ধারাবাহিক বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে এটি দেশজুড়ে বড় ধরনের গ্রিড বিপর্যয়ের সর্বশেষ ঘটনা।
কিউবার জ্বালানি ও খনি মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা ঘটেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়। তবে প্রাথমিক ঘোষণায় গ্রিড বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।
কিউবার কর্তৃপক্ষের বরাতে বার্তা সংস্থা এপি জানায়, দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের সঞ্চালন লাইনে একটি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি হয়। এর প্রভাবে মাতানসাস পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে দেশের পূর্বাঞ্চলও জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অস্থিতিশীল আবহাওয়াও পরিস্থিতি আরও জটিল করে বলে সরকারি সংবাদপত্র গ্রানমা জানিয়েছে।
কিউবার বিদ্যুৎব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সংকটে রয়েছে। দেশটির বেশির ভাগ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোনো। এসব কেন্দ্র সচল রাখতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের ঘাটতিও রয়েছে।
কিউবা নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। বাকি অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।
এপি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি আমদানিসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা কিউবার সংকট আরও বাড়িয়েছে। এর ফলে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জ্বালানি এবং পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি কঠিন হয়ে পড়েছে। মার্চে রাশিয়ার একটি জাহাজ থেকে জ্বালানি পাওয়ার পর আরেকটি বড় জ্বালানি সরবরাহের অপেক্ষায় ছিল কিউবা।
তবে বিদ্যুৎ সংকটের কারণ নিয়ে কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এক নয়। কিউবা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির পরিবর্তনের ওপর চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে।
কিউবায় গত দুই বছরে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতীয় গ্রিড সচল থাকলেও অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে একটানা ৩০ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎহীন থাকার ঘটনাও ঘটেছে।
চলতি বছর মার্চ, মে, জুলাই ও আগস্টেও বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে। আগস্টের শুরুতে দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনবার দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
শুক্রবারের বিপর্যয়ের পর হাভানাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। হাসপাতালসহ জরুরি সেবাকেন্দ্রগুলোকে আগে বিদ্যুৎ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সন্ধ্যার মধ্যে হাভানার মোট গ্রাহকদের প্রায় ৫ শতাংশের বিদ্যুৎ ফিরেছিল বলে এপি জানিয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট কিউবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রান্না, পানি সরবরাহ, মুঠোফোন ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহন ও কর্মঘণ্টাতেও এর প্রভাব পড়ছে। কোথাও কোথাও হাসপাতালের অস্ত্রোপচার পর্যন্ত স্থগিত করতে হয়েছে।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল এর আগে বলেছেন, মার্কিন অবরোধ দেশের জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহে বড় বাধা তৈরি করছে। একই সঙ্গে তিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সরকারি কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিলম্বসহ দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কথাও স্বীকার করেছেন।
তবে তাঁর বক্তব্য, এসব অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দিয়ে বর্তমান সংকটের পুরো মাত্রা ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর মতে, কিউবার অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের প্রধান কারণ হলো দীর্ঘদিনের মার্কিন অবরোধ।
এদিকে কিউবার অর্থনৈতিক সংকটও গভীর হচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের ঘাটতির পাশাপাশি খাদ্য, ওষুধ ও পরিবহনসংকট মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ গ্রিডের বারবার পতন এখন দেশটির বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটেরই একটি দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে উঠেছে।