জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়ানোর তাগিদ

অনলাইন সেমিনারে জলবায়ু অর্থায়ন ও এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

বুধবার (৩০শে সেপ্টেম্বর) ‘দ্য রোড টু আনাতোলিয়া: ক্লাইমেট ফাইন্যান্স অ্যান্ড এনডিসি ৩.০’ শীর্ষক প্রাক-কপ৩১ আন্তর্জাতিক অনলাইন সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদের অধীনে অনুষ্ঠেয় কপ৩১ সম্মেলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট এবং ইউনেস্কো চেয়ার অন এডুকেশন ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট, গ্রিন স্কিলস অ্যান্ড ক্লাইমেট অ্যাকশনস যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটির ব্যবহার কমানো এবং পাহাড় ও টিলা কাটা বন্ধেও সরকার কাজ করছে। পরিবেশ সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌর ও বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

তার মতে, জলবায়ু অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগও বাড়াতে হবে। এ কাজে উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, সরকার পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের কার্যক্রম যুগোপযোগী করার পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য সম্ভাব্য উৎস থেকে অর্থায়ন সংগ্রহের সুযোগ বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, বৃক্ষরোপণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের কার্যক্রম সরকারের পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময় এবং কার্যকর অংশীদারিত্ব জোরদারের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং কপ৩১ সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় করে বাস্তব ফলাফল অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার জরুরি।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এনডিসি ৩.০-এর অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তর করতে হবে। এ জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থায়ন সংগ্রহের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

সেমিনারে এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে জলবায়ু অর্থায়নের নতুন ও বহুমুখী উৎস কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প প্রস্তুত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি অর্থায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

আলোচনায় বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড এবং প্যারিস চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় সহযোগিতামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। বেসরকারি পুঁজি কাজে লাগানোর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নের সমন্বয়ে মিশ্র অর্থায়নের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।

কপ৩১ সম্মেলন সামনে রেখে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে এনডিসি ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তরের বিষয়েও আলোচনা হয়। এসব প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সংগ্রহে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আয়োজকেরা আশা প্রকাশ করেন, সেমিনারের আলোচনা ও সুপারিশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার বাড়াতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়ন এবং কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণের প্রস্তুতিও এতে জোরদার হবে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নূরুল মুনীরের সঞ্চালনায় সেমিনারে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ড. লিওনার্দো এ. এ. তেগুহ সাম্বোদো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিভাগের ড. মারিয়া নেইরা, সিকিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওলাভ মুরলিংক, ইস্তাম্বুল আয়দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এলিফ কায়া, তুরস্কের ওএমইউডির মহাসচিব উমাই ইলমাজ এবং ক্লাইমেট হাব ইন্টারন্যাশনাল, উগান্ডার কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ক্লিনটন মাওয়ান্ডাসহ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *