কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুদের আত্মবিশ্বাস গড়ছে দাবা

কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে সাময়িক ছাউনির নিচে কয়েকজন রোহিঙ্গা শিশু দাবার বোর্ড ঘিরে খেলছে ও অনুশীলন করছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে শিশুদের জন্য দাবা এখন শুধু একটি খেলা নয়। মনোযোগ, ধৈর্য, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করছে এই খেলা। বাস্তুচ্যুত ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য দাবাকে ব্যবহার করা হচ্ছে মানসিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সংযোগ তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে।

আগস্টে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে শুরু হয় ‘সুরক্ষার জন্য দাবা’ কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা, হিমালয়ান দাবা একাডেমি এবং কক্সবাজারে কাজ করা দাতব্য প্রতিষ্ঠান মুভমেন্ট ইন রিফিউজের সহযোগিতায় কর্মসূচিটি পরিচালিত হয়। স্থানীয় অংশীদার হিসেবে মানবিক সহায়তা কর্মসূচিও এতে যুক্ত ছিল।

শিবিরের একটি সাময়িক ছাউনির নিচে কয়েকটি দাবার বোর্ড ঘিরে বসছে শিশুরা। অল্প খরচের একটি দাবার সেট দিয়েই চলছে অনুশীলন। কেউ পরবর্তী চাল নিয়ে ভাবছে। কেউ প্রতিপক্ষের চাল বোঝার চেষ্টা করছে। আবার কেউ নিজের চাল ঠিক করার পর অপেক্ষা করছে ফলাফলের জন্য।

এই সরল দৃশ্যের মধ্যেই কর্মসূচির আয়োজকেরা দেখছেন বড় একটি সম্ভাবনা। দাবার মাধ্যমে শিশুদের একটি নির্দিষ্ট কাজে মনোযোগ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি নিরাপদ পরিসর।

কর্মসূচিটির সঙ্গে যুক্ত স্কটিশ সমাজকর্মী ও মুভমেন্ট ইন রিফিউজের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাগনাস উলফ-মারে বলেন, শিবিরে দাবা চালুর পর শিশুদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ তাকে বিস্মিত করেছে। তার মতে, অল্প কিছু দাবার সেট ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই শিশুদের মধ্যে মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

তিনি এখন শিবিরের আরও অনেক শিশুর কাছে এই সুযোগ পৌঁছে দিতে চান। এজন্য শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই নতুন প্রশিক্ষক তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন নেপালের প্রথম নারী দাবা চ্যাম্পিয়ন মোনালিশা খাম্বু। ২০১৫ সালে তিনি আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থার নারী প্রার্থী দাবা গুরুর স্বীকৃতি পান। নিজের জীবনেও দাবার প্রভাব দেখেছেন তিনি।

নেপালের একটি দরিদ্র গ্রামে বেড়ে ওঠা মোনালিশা ছোটবেলায় কথা বলার সমস্যার কারণে উপহাসের শিকার হতেন। দাবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। পরে দাবার মাধ্যমে ক্রীড়া বৃত্তি পেয়ে কাঠমান্ডুর একটি বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে শরণার্থী শিশুদের কাছে দাবা পৌঁছে দেওয়ার কাজে আগ্রহী করেছে।

মোনালিশার মতে, দাবা আত্মসম্মান তৈরি করতে পারে। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তাও বাড়াতে পারে। শরণার্থী শিবিরের মতো পরিবেশে শিশুদের একসঙ্গে বসা, খেলা ও শেখার সুযোগ তৈরি করাও এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

‘সুরক্ষার জন্য দাবা’ ধারণাটি নতুন নয়। আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা ২০২১ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, লুথেরান বিশ্ব ফেডারেশন, কেনিয়ার দাবা সংগঠন ও কাকুমা দাবা ক্লাবের সহযোগিতায় কেনিয়ার কাকুমা ও কালোবেই শরণার্থী এলাকায় এই কর্মসূচি শুরু করে।

সেখানে দাবাকে শিশু ও তরুণদের জন্য নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মনোযোগ, যুক্তিবোধ, সামাজিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের জুনে সেই উদ্যোগের বিস্তৃত রূপ বাংলাদেশেও আসে। আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থার একটি প্রতিনিধি দল কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির, বিদ্যালয় ও স্থানীয় দাবা সংগঠন পরিদর্শন করে। ওই সফরে প্রায় ৩০০ তরুণ-তরুণী দাবা কার্যক্রমে অংশ নেয়। মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

এর আগে ২০২৩ সালেও কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে দাবা প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উখিয়ার শিবির-৫-এ শরণার্থী বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন, আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা, এশীয় দাবা ফেডারেশনসহ কয়েকটি সংস্থা যুক্ত ছিল।

আগস্টের সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে কুতুপালং শিবিরে দাবা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১০ থেকে ২২ বছর বয়সী শরণার্থী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা বিভাগে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এতে মোট ৬৪ জন অংশ নেয়।

কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত মোনালিশা খাম্বুর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে ৩০ জন দাবা প্রশিক্ষক তৈরির কাজও হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু কয়েকজন শিশুকে দাবা শেখানো নয়। শরণার্থী জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকেই প্রশিক্ষক তৈরি করে ভবিষ্যতে আরও বেশি শিশুর কাছে দাবা পৌঁছে দেওয়া।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কর্মসূচিটি কেবল বিনোদন হিসেবে দাবাকে দেখছে না। আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বাস্তুচ্যুত শিশু ও তরুণদের মানসিক সুস্থতায় সহায়তা করা, সামাজিক সংযোগ বাড়ানো এবং তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।

কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত সেখানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা ছিল। তাদের মধ্যে ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিশু।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো খুব অল্পসংখ্যক শিশু দাবার সুযোগ পেয়েছে। তাই মুভমেন্ট ইন রিফিউজ আগামী দুই বছরে আরও ৫ হাজার শরণার্থী শিশুর কাছে দাবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ মার্কিন ডলার অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। এই অর্থ দিয়ে দাবার সরঞ্জাম সংগ্রহ, স্থানীয় প্রশিক্ষক তৈরি এবং শিশুদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংগঠনটির দীর্ঘমেয়াদি কাজের মধ্যে দাবার পাশাপাশি বিভিন্ন খেলাধুলা, শারীরিক অনুশীলন ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমও রয়েছে।

এই অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর উজবেকিস্তানের সমরকন্দে অনুষ্ঠিত বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াড। বিশ্বের শীর্ষ দাবাড়ুরা যখন সেখানে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন, তখন কক্সবাজারের শরণার্থী শিশুদের জন্য দাবাকে আরও বিস্তৃত করার বার্তাও পৌঁছে দিতে চাইছেন উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।

দাবার বোর্ডে মোট ৬৪টি ঘর। কিন্তু কক্সবাজারের শরণার্থী শিশুদের জন্য এর পরিসর তার চেয়ে অনেক বড়। একটি চাল তাদের কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও মনোযোগী করে। একটি প্রতিযোগিতা তাদের জয়ের অভিজ্ঞতা দেয়। একজন প্রশিক্ষক তাদের নিয়মিত শেখার সুযোগ তৈরি করেন।

বাস্তুচ্যুতির কারণে যেসব শিশুর স্বাভাবিক শৈশব অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য এমন ছোট ছোট সুযোগের গুরুত্ব তাই কম নয়। কক্সবাজারের এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, দাবা শুধু প্রতিপক্ষকে হারানোর খেলা নয়। সঠিক পরিবেশ পেলে এটি শিশুদের শেখা, বন্ধুত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ কল্পনারও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

 

 

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা, মুভমেন্ট ইন রিফিউজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির প্রকাশিত তথ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *