বাংলাদেশকে শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ভোক্তা হয়ে থাকলে চলবে না। নিজস্ব উদ্ভাবন, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দেশকে প্রযুক্তির উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্ধপরিবাহী নকশা, সফটওয়্যার, তথ্যকেন্দ্র ও ডিজিটাল সেবায় বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
রাজধানীর বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন পুরস্কার ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ডিজিটাল অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।
তরুণ উদ্ভাবকদের প্রশংসা করে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আজকের তরুণদের মধ্যে তিনি শুধু কয়েকটি মুখ দেখছেন না। তাঁদের মধ্যে তিনি আগামীর সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছেন। তরুণরা সমস্যার জন্য অভিযোগ না করে নিজেদের মেধা দিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরি করছেন।
এবারের পুরস্কারের জন্য বিভিন্ন খাত থেকে মোট ৩৫৫টি উদ্ভাবনী প্রকল্প জমা পড়ে। দুই দিন মূল্যায়নের পর এর মধ্য থেকে ৪৪টি তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শিল্প, শিক্ষা, ব্যাংকিং, সরকারি প্রশাসন ও নতুন উদ্যোগ খাতের ৪০ জন অভিজ্ঞ বিচারক প্রকল্পগুলো মূল্যায়ন করেন।
এবার ৯টি প্রকল্পকে চ্যাম্পিয়ন, ১০টিকে বিজয়ী এবং ২৫টিকে মেধা পুরস্কার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট, সনদ ও উপহার ভাউচার তুলে দেওয়া হয়।
মন্ত্রী বলেন, বিপুলসংখ্যক উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রমাণ করে বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তির কোনো ঘাটতি নেই। দেশের বিপুল তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং সম্প্রসারিত মোবাইল ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
তবে শুধু অবকাঠামো থাকলেই হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর ওপর দাঁড়িয়ে নিজস্ব উদ্ভাবন, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কার্যকর প্রযুক্তি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
সম্প্রতি চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনের প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নির্মাণে পারস্পরিক সহযোগিতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান বিনিময়, সাশ্রয়ী সংযোগ ও ডিজিটাল জনকল্যাণমূলক প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তরুণ উদ্ভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এবারের পুরস্কার তাঁদের যাত্রার শেষ নয়। এটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। একটি নমুনা উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক পণ্যে এবং সেই পণ্যকে শিল্পে রূপ দিতে গবেষণা, বিনিয়োগ ও যথাযথ নীতি সহায়তা প্রয়োজন। সরকার এ ক্ষেত্রে তরুণ উদ্ভাবকদের পাশে থাকবে।
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তরুণ উদ্ভাবকদের প্রথম গ্রাহক হওয়ার পাশাপাশি তাঁদের পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন মন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্প খাতের কার্যকর সংযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক, মানবিক, কল্যাণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সম্পদ সৃষ্টির সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ভাবন, পুরস্কার বা গবেষণা কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। উদ্ভাবন, গবেষণা ও ব্যবসার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। সরকার, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ এবং প্রকল্পগুলোর সমন্বিত গুচ্ছ তৈরি করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এতে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে উদ্ভাবন উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও উদ্ভাবনকে বাজারে নেওয়া, নতুন উদ্যোগকে সহায়তা দেওয়া এবং বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে এখনও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকার সমন্বিত উদ্ভাবন পরিবেশ গড়ে তুলছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে ভালো। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সংযোগের ঘাটতি রয়েছে। ফলে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবে রূপ দেওয়া যাচ্ছে না।
বিজ্ঞান সচিব জানান, প্রথমবারের মতো আয়োজিত বাংলাদেশ উদ্ভাবন মেলায় উদ্ভাবক, বিনিয়োগকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের একই প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। উদ্ভাবকদের মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার, গবেষণা ও উন্নয়নে কর-সহায়তা এবং আধুনিক গবেষণা সরঞ্জাম আমদানিতে নীতি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ চলছে।
এ কাজে বাংলাদেশ ব্যাংক, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশীদার করা হয়েছে। প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থায়নের পাশাপাশি নতুন উদ্যোগে অর্থায়নের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে উৎপাদননির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; গবেষণা থেকে বাজার; উদ্ভাবন থেকে বাজার এবং অগ্রসীমার প্রযুক্তি।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী অবসরপ্রাপ্ত বলেন, শুধু সংযোগ থাকলেই হবে না। মানসম্মত ইন্টারনেট, উপযুক্ত যন্ত্র এবং সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যেন উদ্ভাবনের পথে বাধা না হয়ে সহায়ক হয়, সেটিই লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলমাস কবীর। আরও উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক রুবাবা দৌলা মতিনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিচারক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
এবারের চ্যাম্পিয়ন ও বিজয়ী উদ্ভাবনগুলো এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি জোটের পুরস্কার ২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের জন্য মনোনীত হবে।
চ্যাম্পিয়ন হওয়া ৯টি উদ্ভাবনের মধ্যে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে রয়েছে সক্রিয়ো টেকনোলজিস লিমিটেডের ‘সক্রিয়ো ডিএমএস’, টেটন প্রাইভেট লিমিটেডের ‘মাইইসিজিএআই’ এবং গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেডের ‘দ্য সুখী ওয়ে’।
শিক্ষার্থী পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এজেন্টআইএএম’, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের ‘ক্রনিক’, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিঙ্ক ভি-১: ব্রেইল এমবসার’, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আরবর’ এবং বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ পাবলিক কলেজের ‘ব্রেইলব্রিজ’। ব্যক্তিগত বা দলীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ‘বিন্দো’।
আয়োজকদের ভাষ্য, তরুণদের উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি এসব উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরাই এবারের আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। পুরস্কারপ্রাপ্ত উদ্ভাবনগুলোকে গবেষণা, বিনিয়োগ ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দেশের প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা আরও বাড়বে।