তীর-ধনুকের প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে অলিম্পিক পদকের স্বপ্ন

লক্ষ্যভেদে প্রস্তুত একজন বাংলাদেশি তীরন্দাজ, হাতে ধনুক ও তীর

একেএম রফিকুল ইসলাম

একটি তীর। সামনে একটি লক্ষ্য। কয়েক মুহূর্তের নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ। তারপর ছুটে যায় তীর। সামান্য ভুলেই বদলে যেতে পারে পুরো ফলাফল।

তীরন্দাজি এমন একটি খেলা, যেখানে শুধু শারীরিক শক্তি দিয়ে সাফল্য আসে না। প্রয়োজন নিখুঁত লক্ষ্যভেদ, শরীরের ভারসাম্য, হাত ও চোখের সমন্বয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ, কৌশল এবং মানসিক স্থিরতা। প্রতিযোগিতার শেষ মুহূর্তে একটি তীরই কখনো জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেয়।

মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে শিকার ও যুদ্ধের কাজে তীর-ধনুক ব্যবহার করেছে। আধুনিক অলিম্পিকে তীরন্দাজির অভিষেক হয় ১৯০০ সালে প্যারিসে। পরে দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে খেলাটি স্থায়ীভাবে অলিম্পিক কর্মসূচিতে ফিরে আসে।

আন্তর্জাতিক তীরন্দাজির নিয়ম ও প্রতিযোগিতার কাঠামো গড়ে তুলতে ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক তীরন্দাজি সংস্থা। বর্তমানে এই সংস্থাই বিশ্ব তীরন্দাজির সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশে সংগঠিত তীরন্দাজির যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালে বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। একই বছর আন্তর্জাতিক আর্চারি সংস্থার সদস্য হিসেবেও বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ঘটে।

এরপর ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার কাঠামো। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আসরে অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। কিন্তু বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের আর্চারির সবচেয়ে বড় পরিচয় তৈরি হয় ২০১৯ সালে।

২০১৯ সালের বিশ্ব তীরন্দাজি চ্যাম্পিয়নশিপে রোমান সানা ইতিহাস তৈরি করেন। নেদারল্যান্ডসের স-হার্টোজেনবোশে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় তিনি পুরুষ একক পুনর্বক্র বিভাগে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন।

এটি ছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের প্রথম পদক। একই প্রতিযোগিতায় রোমান সানা বাংলাদেশের হয়ে  প্রথম সরাসরি অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন।

সানার সাফল্যের পথটিও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কিম উজিনকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন। পরে ইতালির মাউরো নেসপোলিকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করেন।

এই সাফল্যের প্রভাব পড়ে দেশের ভেতরেও। তরুণদের মধ্যে আর্চারি নিয়ে আগ্রহ বাড়ে। একই বছর বাংলাদেশের যুব তীরন্দাজ দল প্রথমবার বিশ্ব যুব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয়।

রোমান সানার সাফল্য অবশ্য একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ২০১৯ সালের দক্ষিণ এশীয় গেমসে বাংলাদেশ আর্চারির ১০টি স্বর্ণপদকের সবকটিই জেতে।

রোমান সানার আন্তর্জাতিক সাফল্য পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে। ২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের লুজানে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বে দিয়ার সঙ্গে মিশ্র দলগত প্রতিযোগিতায় তিনি রৌপ্য পদক জেতেন। এই সাফল্য দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের তীরন্দাজরা শুধু আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় নয়, বিশ্বমানের প্রতিযোগিতাতেও পদকের লড়াইয়ে থাকতে পারে।

তবে অলিম্পিকের পথ ছিল আরও কঠিন।

২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের জন্য বাংলাদেশের হয়ে যোগ্যতা অর্জন করেন সাগর ইসলাম। তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত অলিম্পিক বাছাই প্রতিযোগিতায় পুরুষ একক পুনর্বক্র বিভাগে তিনি রৌপ্য পদক জেতেন। এর মধ্য দিয়ে প্যারিস অলিম্পিকের জন্য বাংলাদেশের একটি ব্যক্তিগত আসন নিশ্চিত হয়।

প্যারিস অলিম্পিকে বাংলাদেশের একমাত্র তীরন্দাজ হিসেবেও অংশ নেন সাগর ইসলাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাঁতারু সোনিয়া খাতুনের সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা বহন করেন তিনি।

বাংলাদেশের আর্চারির সামনে এখন নতুন একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো যৌগিক ধনুকের মিশ্র দলগত প্রতিযোগিতা পদকের লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে অলিম্পিকে আর্চারির ইভেন্টের পদক সংখ্যা পাঁচ থেকে বেড়ে ছয় হবে। নতুন এই প্রতিযোগিতায় একজন নারী ও একজন পুরুষ তীরন্দাজ নিয়ে দল গঠিত হবে।

এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ দেশের যৌগিক ধনুকের তীরন্দাজরাও ইতোমধ্যে এশীয় পর্যায়ে সাফল্যের প্রমাণ দিয়েছে।

২০২৫ সালের এশীয় আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বন্যা আক্তার ও হিমু বাছার যৌগিক মিশ্র দলগত প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদক জেতেন। প্রতিযোগিতায় তারা দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ বাছাই দলকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠেন।

একই আসরে ১৭ বছর বয়সী কুলসুম আক্তার যৌগিক ধনুকের নারী একক বিভাগে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন। এটি ছিল এই বিভাগে বাংলাদেশের প্রথম ব্যক্তিগত এশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ পদক।

মোনের সাফল্যের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে তীরন্দাজি শুরু করেন। অর্থাৎ যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ পেলে অপেক্ষাকৃত নতুন খেলোয়াড়ও অল্প সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উঠে আসতে পারেন।

একজন আন্তর্জাতিক মানের তীরন্দাজ তৈরি করতে শুধু একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণব্যবস্থা।

এখানে প্রশিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাঁড়ানোর ভঙ্গি, ধনুক টানা, লক্ষ্য স্থির করা, তীর ছাড়ার কৌশল, শ্বাস নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিযোগিতার চাপ সামলানো—সবকিছুতেই প্রশিক্ষকের নির্দেশনা প্রয়োজন।

একইভাবে বিচারকদের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। সরঞ্জাম পরীক্ষা, নিয়ম প্রয়োগ, তীরের ফল নির্ধারণ, সমতা ভাঙার নিয়ম, নিরাপত্তা এবং প্রতিযোগিতা পরিচালনায় তাদের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের আর্চারিকে আরও এগিয়ে নিতে তাই শুধু খেলোয়াড় তৈরির দিকে নজর দিলেই হবে না। প্রশিক্ষক, বিচারক, ক্রীড়া বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা কাঠামোকেও একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশের সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি কিছু মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসে। জেলা পর্যায়ে কতগুলো আধুনিক আর্চারি প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে? স্কুল পর্যায় থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত নিয়মিত খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থা কতটা বিস্তৃত? আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক ও বিচারকের সংখ্যা কি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট?

উন্নত মানের ধনুক, তীর এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ কতজন খেলোয়াড় পান? খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি ও ক্রীড়া বিজ্ঞানের সহায়তা কতটা নিয়মিত?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অর্থায়ন নিয়ে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, বিদেশে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং উন্নত সরঞ্জামের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পৃষ্ঠপোষকতা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

শুধু বড় কোনো প্রতিযোগিতার আগে প্রস্তুতি নিলে আন্তর্জাতিক সাফল্য টেকসই হয় না। প্রয়োজন বছরের পর বছর চলা পরিকল্পনা।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দেখিয়েছে যে আর্চারিতে অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব। রোমান সানা ২০১৯ সালে সেই পথ খুলেছেন। সাগর ইসলাম ২০২৪ সালে সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছেন। এশীয় পর্যায়ে যৌগিক ধনুকেও বাংলাদেশের তীরন্দাজরা পদক জিতছেন।

২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে যৌগিক মিশ্র দলগত প্রতিযোগিতা যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের সামনে নতুন একটি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তবে শুধু নতুন একটি পদক ইভেন্ট যুক্ত হলেই সাফল্য আসবে না।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিদ্যালয় থেকে প্রতিভা খোঁজা। সেখান থেকে জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ। এরপর জাতীয় পর্যায়ের উচ্চমানের প্রশিক্ষণ। নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ। ক্রীড়া বিজ্ঞান ও মানসিক প্রস্তুতির সমন্বয়। সবশেষে অলিম্পিকের জন্য নির্দিষ্ট প্রস্তুতি।

এই ধারাবাহিক কাঠামো তৈরি করা গেলে আর্চারি বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে আরও বড় জায়গা করে নিতে পারে। কারণ এখন আর প্রশ্নটি শুধু অলিম্পিকে বাংলাদেশ যাবে কি না—সেটি নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অলিম্পিকে গেছে।

পরবর্তী প্রশ্ন হলো, সেই তীর কি একদিন অলিম্পিকের পদক লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *