‘কোয়াট্রেন’ চার শিল্পীর কাব্যিক অভিব্যক্তি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়নুল গ্যালারিতে ‘কোয়াট্রেন’ যৌথ চিত্রপ্রদর্শনীতে চার তরুণ শিল্পীর আঁকা বিভিন্ন বিষয় ও শৈলীর চিত্রকর্ম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়নুল গ্যালারিতে চলছে চার তরুণ শিল্পীর যৌথ চিত্রপ্রদর্শনী ‘কোয়াট্রেন’। এতে অংশ নিয়েছেন নুহাম পল্লব মণ্ডল, ফারাহিন তানভীন, তানজিদা মুশফিক প্রভা ও নাবিলা মাহমুদ কনক। তাঁদের চারজনের কাজেই বিষয়, রং, গড়ন ও প্রকাশভঙ্গির ভিন্নতা রয়েছে। এই ভিন্নতার মধ্য দিয়েই প্রদর্শনীতে তৈরি হয়েছে চারটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষার সম্মিলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়নুল গ্যালারির মতো ঐতিহ্যবাহী জায়গায় এই প্রদর্শনী আয়োজনের তাৎপর্য কম নয়। এখানে শিল্পীরা কেবল তাদের কাজ প্রদর্শন করছেন না, বরং বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতায় নিজেদের অবস্থান চিহ্নিত করছেন।

শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির চারুকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ পর্বের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রদর্শনীটির আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চার শিল্পী তাঁদের শিল্পচর্চা ও সৃজনশীল অনুসন্ধানের নির্বাচিত কাজ দর্শকদের সামনে তুলে ধরছেন। ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রদর্শনীটি চলবে।

‘কোয়াট্রেন’ মূলত চার পঙ্‌ক্তির কবিতার একটি রূপ। প্রদর্শনীর নামেও রয়েছে চার শিল্পীর স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গিকে একসঙ্গে উপস্থাপনের ইঙ্গিত। এখানে প্রত্যেক শিল্পীর কাজ নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত। আবার বিষয় ও রঙের নানা মিল-অমিল তাঁদের কাজের মধ্যে তুলনা ও সংলাপের সুযোগ তৈরি করেছে।

নুহাম পল্লব মণ্ডলের ক্যানভাসে কাক, ঘোড়া, বিমূর্ত মানবাকৃতি এবং রহস্যময় স্থাপত্য—এসব উপাদান একধরনের সাররিয়েল ও এক্সপ্রেশনিস্ট ভাষা তৈরি করেছে। গাঢ় লাল, নীল, সবুজ ও কালোর ব্যবহার তাঁর কাজে তৈরি করেছে তীব্র আবহ। বিশেষ করে কাকের চিত্রগুলোতে পাখিটির চোখ ও দৃষ্টিভঙ্গি দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

নুহামের ক্যানভাসে কাকের একাধিক চিত্র চোখে পড়ে—গাঢ় লাল, নীল ও সবুজ রঙের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাখিগুলো কেবল প্রাণী নয়, বরং প্রতীক। কাক বাংলা সংস্কৃতিতে বার্তাবাহক, স্মৃতির প্রতীক, আবার অশুভের দ্যোতকও। নুহাম এই দ্বৈততাকে কাজে লাগিয়েছেন। তার কাজগুলোতে কাকের চোখ অস্বাভাবিক রকমের জীবন্ত—দর্শকের দিকে তাকিয়ে থাকা এই চোখগুলো অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

রঙের ঘন স্তর ও অমসৃণ পৃষ্ঠ তাঁর কাজের আরেকটি বৈশিষ্ট্য। কোথাও রঙের ঘনত্ব, কোথাও আঁচড় ও পৃষ্ঠের পরিবর্তন চিত্রে গভীরতা তৈরি করেছে। তবে কয়েকটি কাজে গাঢ় রং ও ভারী পৃষ্ঠের আধিক্য দর্শকের জন্য ছবির বিভিন্ন স্তর অনুধাবন করা কঠিন করে তুলতে পারে।

ফারাহিন তানভীনের চিত্রকর্মে নারী, ফুল, পাখি ও প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। একজন গৃহিণী ও মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি তার কাজে স্পষ্ট—জানালার পাশে বসা নারী, কবুতর কোলে নেওয়া মেয়েটি, ফুলের মাঝে মুখ—এসব চিত্রে একধরনের কোমল নস্টালজিয়া কাজ করে। এসব বিষয়ের মধ্য দিয়ে তিনি দৈনন্দিন জীবনের কোমল মুহূর্তগুলো তুলে ধরেছেন।

তাঁর ছবিতে হালকা গোলাপি, সবুজ ও নীলের ব্যবহার স্নিগ্ধ আবহ তৈরি করে। জলরং ও গৌয়াশের প্রয়োগে রঙের কোমলতা এবং স্তরবিন্যাস বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রকৃতির সঙ্গে নারীর সম্পর্কও তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফুল, পাখি ও প্রজাপতি এখানে নিছক অলংকার নয়; এগুলো ছবির আবেগ ও পরিবেশ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।

তবে নারী ও প্রকৃতিনির্ভর বিষয়ের পুনরাবৃত্তি কিছু কাজে একধরনের মিল তৈরি করেছে। বিষয়ের বৈচিত্র্য আরও বাড়লে তাঁর শিল্পভাষার নতুন দিকগুলো স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তামজিদা মুশফিক প্রভা একজন ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট ও ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে তার পটভূমি তার কাজে স্পষ্ট—বস্ত্রের প্যাটার্ন, জ্যামিতিক রূপ, এবং মুখহীন নারীর প্রতিকৃতি তার স্বাক্ষর। বস্ত্রের নকশা ও পোশাক পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁর অভিজ্ঞতার ছাপ ছবিগুলোর বিন্যাসে দেখা যায়।

নীল কিংবা বেগুনি শাড়ি পরা নারীর অবয়ব তাঁর ছবিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মুখের বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত থাকায় দর্শক নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বদলে বৃহত্তর নারীজীবনের সঙ্গে ছবিগুলোকে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পান। তবে মুখহীনতার এই অর্থ শিল্পীর ঘোষিত বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং ছবিগুলোর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচ্য।

শাড়ির নকশা, পটভূমির জ্যামিতিক বিন্যাস ও মাটির কাছাকাছি বিভিন্ন রঙের ব্যবহার তাঁর কাজে স্বতন্ত্র দৃশ্যভাষা তৈরি করেছে। বাদামি, কমলা, নীল ও বেগুনির সমন্বয়ে ছবিগুলোতে উষ্ণতা ও রহস্যের আবহ দেখা যায়। কোথাও কোথাও নকশার আধিক্য মূল অবয়বের প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে। এই ভারসাম্য তাঁর ভবিষ্যৎ শিল্পচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নাবিলা মাহমুদ কনকের কাজে নির্দিষ্ট অবয়বের চেয়ে রং, পৃষ্ঠ ও রেখার বিন্যাস বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষার পটভূমি থেকে শিল্পচর্চায় ফিরে আসার অভিজ্ঞতা তাঁর যাত্রাকে স্বতন্ত্র করেছে। তাঁর চিত্রকর্মে গাঢ় সবুজ, নীল, লাল ও মাটির রঙের বিভিন্ন স্তর দেখা যায়।

রঙের ঘনত্ব, পৃষ্ঠের অমসৃণতা এবং স্তরে স্তরে রঙ প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি অনুভূতি প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। এসব কাজে দর্শককে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা অবয়ব খুঁজে বের করার চেয়ে রঙের বিন্যাস ও পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে মনোযোগ দিতে হয়।

বিমূর্ত চিত্রের ক্ষেত্রে দর্শকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই ছবি বিভিন্ন দর্শকের কাছে ভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে। তবে কয়েকটি কাজে রঙের ঘন ব্যবহার দৃশ্যগত ভারসাম্যকে জটিল করেছে। রঙের স্তরগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হলে ছবির প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে।

চার শিল্পীর কাজ পাশাপাশি রাখলে তাঁদের বিষয় ও প্রকাশভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট হয়। ফারাহিনের ছবিতে প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের কোমলতা রয়েছে। তানজিদার কাজে নারী ও বস্ত্রের নকশা জ্যামিতিক বিন্যাসে প্রকাশিত হয়েছে। নুহাম প্রতীকী অবয়বের মধ্য দিয়ে রহস্যময় আবহ তৈরি করেছেন। অন্যদিকে নাবিলা রং ও পৃষ্ঠের বিন্যাসে আবেগ প্রকাশ করেছেন।

রঙের ব্যবহারেও এই পার্থক্য লক্ষণীয়। ফারাহিনের হালকা রঙের পাশে নুহামের গাঢ় রঙ ভিন্ন আবহ তৈরি করে। তানজিদার নকশানির্ভর বিন্যাসের সঙ্গে নাবিলার বিমূর্ত প্রকাশভঙ্গিরও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই বৈচিত্র্য দর্শককে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রকর্ম দেখার সুযোগ দেয়।

প্রদর্শনীতে কাঠের ফ্রেমের অভিন্ন ব্যবহার কাজগুলোর মধ্যে দৃশ্যগত সংযোগ তৈরি করেছে। তবে ভিন্ন মাধ্যম ও শৈলীর কাজ পাশাপাশি থাকায় কোথাও কোথাও দৃশ্যগত বৈপরীত্যও তৈরি হয়েছে। এই বৈপরীত্য প্রদর্শনীর বিন্যাসে কীভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, তা নিয়ে দর্শকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

‘কোয়াট্রেন’ কেবল চারজন শিল্পীর কাজ একত্রে প্রদর্শনের আয়োজন নয়। এটি তাঁদের শিল্পচর্চার বর্তমান পর্যায়কে বোঝারও একটি সুযোগ। চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে অর্জিত দক্ষতা, ব্যক্তিগত আগ্রহ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাঁদের কাজে ভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

প্রদর্শনীর কাজগুলোতে স্বতন্ত্রতার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কোথাও বিষয়ের পুনরাবৃত্তি, কোথাও রঙের আধিক্য, আবার কোথাও নকশার ঘনত্ব ছবির প্রকাশকে প্রভাবিত করেছে। এসব দিক তাঁদের পরবর্তী শিল্পচর্চায় নতুন অনুসন্ধানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

চার শিল্পীর কাজের মধ্যে কোনো একক শৈলী প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নেই। বরং প্রত্যেকে নিজস্ব বিষয় ও প্রকাশভঙ্গি নিয়ে হাজির হয়েছেন। এই স্বাতন্ত্র্যই ‘কোয়াট্রেন’-এর মূল বৈশিষ্ট্য। জয়নুল গ্যালারিতে তাঁদের এই যৌথ উপস্থাপনা ভবিষ্যতের শিল্পযাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

 

আরো পড়ুন : নদী কেড়ে নিয়েছে বাড়ি, স্মৃতিতে রয়ে গেছে শেকড়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *