রঙে-রেখায় নিজেদের জগৎ তুলে ধরল অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা

ঢাকার সফিউদ্দিন শিল্পালয়ে ‘আ ওয়ার্ল্ড অব আওয়ার ওন’ শিল্পপ্রদর্শনীতে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের আঁকা বিভিন্ন ছবি ও সৃজনশীল শিল্পকর্ম

ঢাকায় অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি ও সৃজনশীল শিল্পকর্ম নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘আ ওয়ার্ল্ড অব আওয়ার ওন’ শীর্ষক শিল্পপ্রদর্শনী। অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে প্রায় ৮৪টি শিল্পকর্ম। এসব কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, পাখি, ফুল, নদী, নৌকা ও বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার নানা দিক তুলে ধরেছে।

৮ই অক্টোবর বিকেল ৪টায় ঢাকার সফিউদ্দিন শিল্পালয়ে প্রদর্শনীটির উদ্বোধনী হয়। এটি অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের তৃতীয় বার্ষিক শিল্পপ্রদর্শনী। প্রদর্শনীটির স্লোগান — “হোয়্যার এভরি কালার টেলস এ স্টোরি, অ্যান্ড এভরি পার্স্পেক্টিভ ম্যাটার্স” — ইঙ্গিত দেয় যে এখানে শিল্পকে বিচার করা হবে প্রচলিত নান্দনিক মাপকাঠিতে নয়, বরং এক অনন্য সংবেদনশীলতার ভাষায়। ক্যানন স্কুলের অটিজম-আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের সৃষ্টি নিয়ে এই প্রদর্শনী দর্শককে আমন্ত্রণ জানায় “প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির ওপারে” দেখতে।।

প্রদর্শনীর অধিকাংশ ছবিতে ফুটে উঠেছে বাংলার চেনা প্রকৃতি। পদ্মফুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, সূর্যমুখী, নারিকেলগাছ, বাঁশঝাড়, নদী ও নৌকার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।  — এই উপাদানগুলো বারবার ফিরে এসেছে। এটি শুধু সৌন্দর্যের চিত্রায়ণ নয়, বরং মাতৃভূমির সাথে গভীর সংযোগের প্রকাশ।

ঘোড়ার গাড়ি, কলাপাতার ছাতা, খড় বহনকারী কৃষক, পালতোলা নৌকা, গ্রামীণ ঘর — এই ছবিগুলো হারিয়ে যাওয়া বাংলার স্মৃতিচারণ। আশ্চর্যের বিষয়, অটিজম-আক্রান্ত শিশুরা, যাদের অনেকের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সীমিত, তারা এই সামগ্রিক সাংস্কৃতিক স্মৃতি এত স্পষ্টভাবে ধারণ করতে পেরেছেন।

বাংলাদেশের পতাকা হাতে শিশু এবং হাতে ধরা জাতীয় পতাকা — এই দুটি কাজ ইঙ্গিত দেয় যে শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবেশ থেকে দেশপ্রেমের বার্তা গ্রহণ করেছেন এবং তা প্রকাশ করেছেন। এসব কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিচিত পরিবেশ, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের নানা দিক দৃশ্যমান হয়েছে।

প্রদর্শনীতে পাখি বিশেষভাবে বারবার এসেছে, যা স্বাধীনতা ও উড্ডয়নের প্রতীকী আকাঙ্ক্ষা হতে পারে। ময়ূর, টিয়া, হাঁস, মুরগির ছানা, মাছ, ফড়িং ও মৌমাছি নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন শিল্পকর্ম। হাতের ছাপ ব্যবহার করে আঁকা ময়ূরের ছবিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মানুষের দৈনন্দিন জীবনও শিক্ষার্থীদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। বৃষ্টিতে ছাতা ধরা শিশু, নৌকাবাইচ, দুই বালিকার ছবি এবং বাঙালি নারীর প্রতিকৃতি রয়েছে প্রদর্শনীতে।

প্রদর্শনীতে জলরং ও পোস্টার রঙের পাশাপাশি সূচিকর্ম, পাতা ও বীজ দিয়ে তৈরি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। মিশ্র মাধ্যমেও কাজ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

কালো হাসের সূচিকর্ম এবং পাতা ও বীজ ব্যবহার করে তৈরি পাখি ও ছানার শিল্পকর্ম মাধ্যমের বৈচিত্র্য তুলে ধরেছে। কোনো কোনো কাজে সরাসরি হাতের ছাপ ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু কাজে ক্রয়ন/স্ক্রিবল কৌশল (যেমন অ্যাবস্ট্রাক্ট পাখির কাজ) দেখা যায়, যা অটিজম শিল্পের একটি স্বীকৃত শৈলী। এসব পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।

ছবিগুলোতে উজ্জ্বল রঙের পাশাপাশি মুক্ত রেখা ও স্বতঃস্ফূর্ত আঁকার ধরন লক্ষ করা যায়। কিছু কাজে একই ধরনের ফুল, পাখি বা নৌকার পুনরাবৃত্তি রয়েছে। কোথাও বিষয়বস্তুকে ছবির মাঝখানে রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো কাজে সরল ও সমতল বিন্যাস দেখা যায় যা শিশুশিল্প এবং ফোক আর্টের বৈশিষ্ট্য।

এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে কেবল প্রচলিত শিল্পরীতির মাপকাঠিতে বিচার না করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজস্ব প্রকাশভঙ্গির অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।

শিল্পকর্মগুলো বিভিন্ন আকারের দলে সাজিয়ে দেয়ালে প্রদর্শন করা হয়েছে। অধিকাংশ ছবিতে গাঢ় রঙের কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু ছবিতে রয়েছে হালকা কাঠের ফ্রেম। সাদা পটভূমির ব্যবহার ছবিগুলোর মধ্যে সামগ্রিক সামঞ্জস্য তৈরি করেছে।

তবে প্রদর্শনীর বিন্যাসে আরও পরিকল্পিত উপস্থাপনার সুযোগ ছিল। প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, মানুষ, প্রাণী ও কল্পনাভিত্তিক কাজগুলো আলাদা ভাগে সাজানো হলে দর্শকের পক্ষে বিষয়গুলো বুঝতে সুবিধা হতো।

ছবির নিচে পরিচিতির লেবেল থাকলেও সেগুলো পড়তে অনেকের অসুবিধা হতে পারে। প্রতিটি কাজের সঙ্গে শিল্পীর নাম, বয়স ও ছবির শিরোনাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলে দর্শকেরা শিল্পী ও তাঁর কাজ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারতেন।

এ ছাড়া প্রদর্শনীর ক্যাটালগে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব বক্তব্য কিংবা শিক্ষক ও অভিভাবকদের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য যুক্ত করা হলে ছবিগুলোর পেছনের অভিজ্ঞতা ও সৃজনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হতো।

অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাঁদের সৃজনশীলতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেকের স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের বিষয় একাধিক ছবিতে ফিরে এলেও সেগুলোকে শুধু পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি শিল্পীর রং নির্বাচন, রেখা টানা ও বিষয় উপস্থাপনের ধরনে নিজস্বতা থাকতে পারে।

একই সঙ্গে সব অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিল্পীর কাজের মধ্যে একই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকবে, এমন ধারণাও যথাযথ নয়। তাঁদের আগ্রহ, দক্ষতা, অনুভূতি ও প্রকাশের ধরন ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

এই বিবেচনায় ‘আ ওয়ার্ল্ড অব আওয়ার ওন’ প্রদর্শনীটি শিক্ষার্থীদের কাজ দেখার পাশাপাশি তাঁদের সৃজনশীলতার বৈচিত্র্য বোঝারও একটি সুযোগ তৈরি করেছে। শিল্পের মূল্য শুধু নিখুঁত অনুকরণ কিংবা প্রচলিত কৌশল আয়ত্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজস্ব অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও কল্পনাকে প্রকাশ করার মধ্যেও শিল্পের তাৎপর্য রয়েছে।

‘আ ওয়ার্ল্ড অব আওয়ার ওন’ প্রদর্শনীটি প্রমাণ করে যে শিল্প কোনো বিশেষায়িত দক্ষতার একচেটিয়া অধিকার নয়। এটি একটি মানবিক অধিকার — অনুভব করা, প্রকাশ করা, এবং দৃশ্যমান হওয়ার অধিকার। এই ৮৪টি কাজের প্রতিটি একটি জানালা — তা এমন জগতের জানালা যেখানে রঙ কথা বলে, রেখা গান গায়, এবং প্রতিটি ছবির পেছনে একটি গল্প লুকিয়ে আছে। প্রদর্শনীর শিরোনাম যেমন ইঙ্গিত দেয় — এটি তাদের জগৎ। কিন্তু সত্যি বলতে, এটি এমন এক জগৎ যা আমাদের সবার হওয়া উচিত — যেখানে প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যবান, এবং প্রতিটি সৃষ্টি উদযাপনের যোগ্য।

অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন এবং ক্যানন স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের এই অক্লান্ত প্রচেষ্টার প্রশংসা করতেই হবে। তারা শুধু শিল্প প্রদর্শনী আয়োজন করেননি — তারা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের একটি ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

আরো পড়ুন : নদী ও পাখির গল্পে পরিবেশ রক্ষার বার্তা

One thought on “রঙে-রেখায় নিজেদের জগৎ তুলে ধরল অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *