বিশ্বজুড়ে সশস্ত্র সংঘাতের বিস্তার, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুন সমীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ধর্মীয় ও আদর্শিক বিরোধের পাশাপাশি তেল, কৌশলগত খনিজ, বাণিজ্যপথ এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের স্বার্থও এসব সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন-এ প্রকাশিত ড. রাজা মুহাম্মদের বিশ্লেষণে লোহিত সাগর থেকে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের (ইউসিডিপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে রাষ্ট্র জড়িত ছিল এমন সক্রিয় সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা ছিল ৬৫— যা ১৯৪৬ সালে তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ১৩টি সংঘাতকে যুদ্ধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। তবে সংঘাতের সংখ্যা বাড়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি সংঘাতের কারণ একই; অঞ্চল, পক্ষ ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কারণও ভিন্ন।
ড. রাজা মুহাম্মদের বিশ্লেষণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, যুদ্ধবিরতি এবং ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের পর সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব রয়ে গেছে।
জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম, নৌপরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবাহিত হওয়ায় এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
বিশ্লেষকের বক্তব্য, এসব সংঘাতকে শুধু ধর্মীয় বা আদর্শিক বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং কৌশলগত বাণিজ্যপথের ওপর প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাও বিবেচনায় নিতে হবে।
লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। এসব স্থানে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং পণ্য সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিতে পারে।
২০২৫ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এ পদক্ষেপ সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা নিয়ে নতুন কূটনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে। সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের স্বীকৃতি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অভিপ্রায় এই ভূ-কৌশলগত চিত্রকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যুক্ত করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত চাপ? যাই হোক না কেন, এর ইঙ্গিত স্পষ্ট যে, বাহ্যিক সমর্থন নিয়ে হুথি বিদ্রোহী এবং সোমালিল্যান্ড যেকোনো সময় বাব-আল-মানদেব এবং লোহিত সাগরের সামুদ্রিক রুট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ কৌশলকে সামনে রেখে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, এই সংঘাতের মূল লক্ষ্য হলো তেল, কৌশলগত খনিজ সম্পদ এবং সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ অংশগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা। এর পাশাপাশি পেট্রোডলারের প্রাধান্য বজায় রাখা, ইসরায়েলের সম্প্রসারণমূলক নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক নতুন নিরাপত্তা স্থাপত্য তৈরি করাও এই কৌশলের অংশ। ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ন্ত্রণ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার সম্পদ আহরণ, এমনকি গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন-ডেনমার্ক চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া ও চীনের প্রবেশাধিকার ঠেকানো—সবকিছুই এই বৃহত্তর কৌশলের অঙ্গ।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং তেল প্রবাহে বিঘ্নের মূল সুবিধাভোগীরা হলো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো, বীমা ও শিপিং কোম্পানি, কালোবাজারি চক্র এবং সামরিক-শিল্প গোষ্ঠী । উল্লেখ্য, যুদ্ধের মধ্যেও ইরান তেল বিক্রি থেকে কোটি কোটি ডলার আয় করছে এবং ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে রাশিয়ান গ্যাস প্রবাহিত হয়ে ইউক্রেন রয়্যালটি পাচ্ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলকে এই পর্যায়ের যুদ্ধের সরাসরি ক্ষতির বাইরে রাখা হয়েছে, যাতে তারা পুনর্গঠন ও পুনঃসজ্জিত হয়ে ফিলিস্তিনে তাদের সম্প্রসারণমূলক নীতি ও নিপীড়ন অব্যাহত রাখতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর বিশ্বব্যবস্থা পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে।
একই সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাণিজ্য, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিতে চীনের বিস্তৃত অংশীদারত্ব তার আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়িয়েছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রও নিজের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
এই প্রতিযোগিতা সব সময় সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয় না। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যনীতি, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক জোটের মাধ্যমেও শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। ফলে বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন বুঝতে সামরিক পরিস্থিতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিও বিবেচনা করা জরুরি।
ড. রাজা মুহাম্মদের মতে, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনীতি ও রাজনৈতিক সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালীর ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে সমঝোতা ভবিষ্যৎ আলোচনার বিষয় হতে পারে।
বিশ্লেষণে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা এবং ইয়েমেনকেন্দ্রিক সংকটের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে পাকিস্তান ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি, সমঝোতার শর্ত এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর। কোনো মধ্যস্থতা বা যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে—এমন সিদ্ধান্ত আগাম দেওয়া যায় না।
লোহিত সাগর থেকে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখায়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই অঞ্চলে সংঘাতের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা বিশ্ববাজার, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সংকট মোকাবিলায় সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আলোচনার পথ খোলা রাখা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত কমানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, পাকিস্তান।
আরো পড়ুন : মধ্যপ্রাচ্যে কমছে মার্কিন প্রভাব, বদলাচ্ছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি