ব্রাজিলের দ্বিতীয় দফার নির্বাচন: গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও বহুপাক্ষিকতার প্রশ্ন

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখন দ্বিতীয় দফায় গড়িয়েছে। ৪ঠা অক্টোবরের প্রথম দফায় সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭.০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা ৪৫.১৬ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। কেউই বৈধ ভোটের অর্ধেকের বেশি না পাওয়ায় আগামী ২৫শে অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় মুখোমুখি হবেন তারা।

প্রথম দফার ফলাফলকে শুধু দুই প্রার্থীর ব্যবধান দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। নির্বাচনী প্রচারে অর্থনীতি, জননিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি সামনে এসেছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, ব্রাজিলের কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং কৌশলগত খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে জোস রিকার্দো মার্টিনসের বিশ্লেষণে ব্রাজিলের নির্বাচনকে দেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি ও বহুপাক্ষিক অবস্থানের দিক থেকেও দেখা হয়েছে। তবে তাঁর লেখার কিছু রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও অভিযোগ বিতর্কিত; সেগুলোকে তথ্য হিসেবে গ্রহণের আগে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

লুলা ২০২৩ সালে আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বহুপাক্ষিকতা, ব্রিকস এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করেছে।

অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর বাবা জাইর বলসোনারোর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে নিরাপত্তা ও রক্ষণশীল রাজনীতির ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর নির্বাচনী অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা। সাম্প্রতিক প্রচারে তিনি ব্রাজিলের অপরাধী সংগঠনগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।

তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—ব্রাজিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কতটা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখবে।

ব্রাজিল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক গত কয়েক বছরে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের মামলায় সাজা ঘোষণার পর তাঁর ছেলে এদুয়ার্দো বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের কাছে চাপ তৈরির চেষ্টা করেছেন। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এদুয়ার্দো নিজেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ব্রাজিলীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের জন্য তাঁর প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছিলেন।

২০২৬ সালের জুনে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আদালত এদুয়ার্দো বলসোনারোকে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে তাঁর বাবার বিচার বন্ধে চাপ তৈরির অভিযোগে চার বছর দুই মাসের কারাদণ্ড দেয়। আদালতের চার বিচারপতিই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালের মে মাসে ব্রাজিলের অপরাধী সংগঠন পিসিসি এবং কমান্ডো ভেরমেলহোকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার ঘোষণা দেয়; সিদ্ধান্তটি ৫ই  জুন থেকে কার্যকর হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংগঠন দুটিকে ব্রাজিলের সবচেয়ে সহিংস অপরাধী সংগঠনগুলোর মধ্যে উল্লেখ করেন।

ব্রাজিলে এ সিদ্ধান্তের নিরাপত্তাগত প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যেমন আলোচনা রয়েছে, তেমনি এর রাজনৈতিক ও সার্বভৌমত্বগত প্রভাব নিয়েও বিতর্ক আছে। ফলে সংগঠিত অপরাধ দমনের প্রশ্নটি এখন দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

ফ্লাভিও বলসোনারোর নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে ‘ডার্ক হর্স’ নামের তাঁর বাবা জাইর বলসোনারোকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের অর্থায়ন।

ব্রাজিলের সাবেক ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারোর সঙ্গে ফ্লাভিওর অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন তদন্তভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলচ্চিত্রটির জন্য ভোরকারোর কাছ থেকে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ ব্রাজিলীয় রিয়াল নেওয়া হয়েছিল। পরে আরও অর্থ স্থানান্তরের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। ফ্লাভিও ভোরকারোর কাছ থেকে চলচ্চিত্রের জন্য অর্থ চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও কোনো বিনিময় বা অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাভিও বর্তমানে ব্যাংক মাস্টার-সংক্রান্ত সম্ভাব্য দুর্নীতি ও অর্থপাচারের তদন্তের আওতায় রয়েছেন। তদন্তের কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোর একটি হলো ভোরকারোর অর্থ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি তহবিলে যাওয়ার ঘটনা, যা এদুয়ার্দো বলসোনারোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ফ্লাভিও ও এদুয়ার্দো উভয়েই কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন।

নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ব্রাজিলের কৌশলগত খনিজ সম্পদ, বিশেষ করে বিরল মৃত্তিকা উপাদান।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে লুলা সরকার জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত খনিজ নীতি অনুমোদন করেছে। সরকারি নীতির ঘোষিত লক্ষ্য হলো শুধু খনিজ উত্তোলন নয়, দেশেই এগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, গবেষণা এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন করা। এ নীতিতে গবেষণা, উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রায় ৭ বিলিয়ন রিয়াল পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।

লুলা এর আগে স্পষ্ট করে বলেছেন, বিদেশি কোম্পানি ব্রাজিলের কৌশলগত খনিজ খাতে অংশ নিতে পারবে, কিন্তু সম্পদের ওপর ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে।

এই অবস্থান কেবল নির্বাচনী বক্তব্য নয়; ২০২৬ সালের নতুন নীতিতেও দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে বিরল মৃত্তিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অন্যান্য শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে ব্রাজিল নিজের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা বাড়াতে পারে, সেটিও ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জাইর বলসোনারোর ২০১৯–২০২২ মেয়াদের পর ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতিতে লুলা বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। জলবায়ু কূটনীতি, বৈশ্বিক দক্ষিণ, ব্রিকস এবং জাতিসংঘকেন্দ্রিক বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় ব্রাজিলের সক্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।

এর রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো—ব্রাজিল যদি একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে কোনো একটি বৃহৎ শক্তির ওপর তার নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এটিই লুলার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশ্লেষক জোস রিকার্দো মার্টিনসও যুক্তি দিয়েছেন, বহুপাক্ষিকতা ব্রাজিলের জন্য শুধু কূটনৈতিক মর্যাদার বিষয় নয়; এটি সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি মাধ্যম। তবে এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকের রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা উচিত।

ব্রাজিলের নির্বাচনে জননিরাপত্তা দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। ফ্লাভিও বলসোনারো কঠোর অপরাধ দমন এবং অপরাধী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

অন্যদিকে, পিসিসি ও কমান্ডো ভেরমেলহোকে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার সিদ্ধান্তের পর প্রশ্ন উঠেছে—ব্রাজিল নিজে সংগঠিত অপরাধকে কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করবে এবং এই ক্ষেত্রে বিদেশি সহযোগিতার সীমা কোথায় থাকবে।

এখানে অপরাধী সংগঠন ও সন্ত্রাসী সংগঠনের মধ্যে আইনি পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের আইনি শ্রেণিবিন্যাস এবং ব্রাজিলের নিজস্ব আইন এক নয়। তাই কোনো সংগঠনকে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলেই ব্রাজিলের আইনেও একই শ্রেণিবিন্যাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

ব্রাজিলের ২০২৬ সালের প্রথম দফার ফলাফল তুলনামূলকভাবে কম ব্যবধানে নির্ধারিত হয়েছে। ৪ঠা অক্টোবর ফ্লাভিও ৪৭.০৩ শতাংশ এবং লুলা ৪৫.১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। ২৫শে অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হবে।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর জাইর বলসোনারোর পরাজয় মেনে না নেওয়া এবং পরবর্তী অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের ঘটনায় ব্রাজিল ইতোমধ্যে একটি বড় সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ২০২৫ সালে জাইর বলসোনারোকে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের মামলায় ২৭ বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়।

ফ্লাভিও নিজে অবশ্য নির্বাচনী ফল মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে তাঁর বাবার জন্য সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

অতএব, দ্বিতীয় দফার নির্বাচন শুধু কে প্রেসিডেন্ট হবেন—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক, ২০২২-পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাতের নিষ্পত্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ দিক।

২৫শে অক্টোবরের দ্বিতীয় দফায় ব্রাজিলের ভোটাররা মূলত দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন। একদিকে লুলার অধীনে বহুপাক্ষিকতা, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতির ওপর জোর; অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারোর অধীনে নিরাপত্তা, রক্ষণশীল রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি।

তবে নির্বাচনের ফলাফল যেদিকেই যাক, ব্রাজিলের জন্য বড় প্রশ্নগুলো থেকে যাবে—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্থিতিশীল থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকবে, এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান শক্তি হিসেবে দেশটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কতটা স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখতে পারবে।

সূত্র: জোস রিকার্দো মার্টিনসের বিশ্লেষণ; ব্রাজিলের সর্বোচ্চ নির্বাচনী আদালত, রয়টার্স, এজেন্সিয়া ব্রাসিল ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র।


 

 

আরো পড়ুন : ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে শীতের খরচ বাড়ার আশঙ্কা

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *