রেইউনিয়নের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ‘মারমাঈ’, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে বিশেষ প্রদর্শনী

ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ‘মারমাঈ’ চলচ্চিত্রের বিশেষ প্রদর্শনী

ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফরাসি চলচ্চিত্র ‘মারমাঈ’-এর বিশেষ প্রদর্শনী। ২০২৪ সালে নির্মিত চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক গ্রিগরি লুসিলি। এটি তার নির্মিত প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। প্রদর্শনীর পর পরিচালকের সঙ্গে দর্শকদের সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে চলচ্চিত্র নির্মাণ, চরিত্র এবং পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।

‘মারমাঈ’ নির্মিত হয়েছে ভারত মহাসাগরের ফরাসি দ্বীপ রেইউনিয়নের সামাজিক বাস্তবতাকে ঘিরে। চলচ্চিত্রটির গল্প আবর্তিত হয়েছে ১৫ বছর বয়সী থমাস ও তার বোন অড্রেকে নিয়ে। থমাসের স্বপ্ন নৃত্য প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করে ফ্রান্সে যাওয়া। কিন্তু পারিবারিক সংকট তাদের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।

‘মারমাঈ’ মূলত ফরাসি ও রেইউনিয়নের স্থানীয় ক্রেওল ভাষায় নির্মিত। ‘মারমাঈ’ শব্দটি স্থানীয় ক্রেওল ভাষায় সাধারণত “শিশু” বা “কিশোর-কিশোরী” বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৪ মিনিট। স্থানীয় অপেশাদার অভিনয়শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং রেইউনিয়নের সামাজিক বাস্তবতার সরাসরি উপস্থাপন চলচ্চিত্রটিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

‘মারমাঈ’-এর গুরুত্ব শুধু এর কাহিনিতে নয়। চলচ্চিত্রটির নির্মাণের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। রেইউনিয়ন ফ্রান্সের একটি সমুদ্রপারের অঞ্চল। অথচ চলচ্চিত্রটির গল্প মূলত দ্বীপটির নিজস্ব মানুষ ও তাদের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি।

এখানে রেইউনিয়নকে পর্যটনের পরিচিত ছবি দিয়ে দেখানো হয়নি। সমুদ্র, পাহাড় কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বদলে মানুষের ব্যক্তিগত সংকটকে সামনে রাখা হয়েছে। ফলে দ্বীপটি গল্পের পটভূমি নয়। বরং গল্পের একটি সক্রিয় অংশ হয়ে উঠেছে।

ভাষার ব্যবহারও এই নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ দিক। স্থানীয় ক্রেওল ভাষাকে চলচ্চিত্রের প্রধান প্রকাশভঙ্গির অংশ করা হয়েছে। এর ফলে চরিত্রগুলোর সংলাপে স্থানীয় জীবনের স্বাভাবিকতা এসেছে। একই সঙ্গে এটি ফরাসি মূল ভূখণ্ডের বাইরে থাকা একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসে।

অভিনয়শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। পেশাদার তারকার বদলে স্থানীয় তরুণদের ব্যবহার করার ফলে অভিনয়ে কৃত্রিমতা কমেছে। বিশেষ করে ম্যাক্সিম কালিশারানের নৃত্যশিল্পী হিসেবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থমাস চরিত্রকে প্রাণবন্ত করেছে।

নৃত্যের ব্যবহারও শুধু দৃশ্যগত আকর্ষণের জন্য নয়। থমাসের ভেতরের অস্থিরতা প্রকাশে এটি একটি ভাষার মতো কাজ করে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এক কিশোরের জন্য নৃত্য হয়ে ওঠে নিজের অস্তিত্ব জানানোর মাধ্যম। এই কারণে নৃত্য ও পারিবারিক সংকট একই বয়ানে যুক্ত হয়েছে।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভাই-বোনের সম্পর্ক। বাবা-মায়ের অনুপস্থিতি তাদের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি করে, তারা অনেকাংশে একে অন্যের ওপর নির্ভর করে তা পূরণ করার চেষ্টা করে। থমাসের স্বপ্ন এবং অড্রের দায়িত্ববোধ তাদের আলাদা পথে ঠেলে দিলেও পারিবারিক সংকট তাদের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করে।

তবে চলচ্চিত্রটির সামাজিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, অকাল মাতৃত্ব, অবহেলা এবং শিল্পের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ—এসব বিষয় চলচ্চিত্রে বহুবার এসেছে। ফলে ‘মারমাঈ’-এর বিষয়গুলো নতুন না হলেও এর বিশেষত্ব নিহিত রয়েছে রেইউনিয়নের নির্দিষ্ট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে এসব বিষয়কে যুক্ত করার মধ্যে।

চিত্রনাট্যের কিছু অংশ যদি বাবা-মায়ের অতীত ও পারিবারিক দ্বন্দ্বকে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করত, তাহলে চরিত্রগুলোর সিদ্ধান্ত ও আচরণের পেছনের কারণগুলো আরও স্পষ্ট হতে পারত বলে মনে হয়েছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু জায়গায় গল্পের পরিণতি অনুমানযোগ্য হয়ে ওঠে।

তারপরও ‘মারমাঈ’কে রেইউনিয়নের নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। বিশেষ করে স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় অভিনয়শিল্পী এবং দ্বীপের সামাজিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে নিয়ে আসা ছবিটির আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।

ঢাকার প্রদর্শনীতে পরিচালকের সঙ্গে দর্শকদের সরাসরি প্রশ্নোত্তর সেই পরিচয়কে আরও বিস্তৃত করেছে। একটি দূরবর্তী দ্বীপের পারিবারিক গল্প সেখানে এসে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের দর্শকদের চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতার সঙ্গে। ফলে ‘মারমাঈ’-এর আলোচনাটি শুধু একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি পরিবার, পরিচয়, কৈশোর, সামাজিক বাস্তবতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্নে একটি আন্তঃসাংস্কৃতিক আলোচনার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।

 

 

আরো পড়ুন : মাত্র ৬৪ সিনেমা পেরিয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারের দেয়াল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *