আমিরাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ লাখ নতুন কর্মীর চাহিদা, সুযোগ দক্ষ বাংলাদেশিদেরও

সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতের প্রতীকী চিত্র

সংযুক্ত আরব আমিরাতে আগামী কয়েক বছরে কর্মসংস্থানের বড় বাজার তৈরি হতে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ১০ লাখ ৩০ হাজার অতিরিক্ত কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে।

সার্ভিসনাউ ও পিয়ারসনের করা দক্ষতা-চাহিদা পূর্বাভাসে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে আমিরাতের মোট কর্মসংস্থান প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বাড়তে পারে। বড় অর্থনীতিগুলোর তুলনায় এ প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

তবে পুরো ১০ লাখ নতুন কর্মী প্রযুক্তি খাতে নিয়োগ পাবেন না। বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান বাড়বে। উৎপাদন খাতে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার, শিক্ষা খাতে ৭৮ হাজার এবং খুচরা ব্যবসায় ৬০ হাজার নতুন কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে। অর্থ, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতেও বাড়বে কর্মীর চাহিদা।

প্রযুক্তি খাত অবশ্য এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আমিরাতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের চাহিদা ৫৪ শতাংশ বাড়তে পারে। এ সময়ে ৯১ হাজারের বেশি অতিরিক্ত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন হবে।

প্রোগ্রাম তৈরি, কম্পিউটার ব্যবস্থা বিশ্লেষণ, তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি দক্ষতার চাহিদা বাড়বে। কর্মীদের নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জন এবং পুরোনো দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনও বাড়বে।

আমিরাত ইতোমধ্যে অর্থনীতিকে প্রযুক্তিনির্ভর করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি কৌশলের লক্ষ্য হলো আগামী এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে ডিজিটাল অর্থনীতির অবদান প্রায় দ্বিগুণ করা। ২০২২ সালে এ অবদান ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। লক্ষ্য ১৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেওয়া।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও এই পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে আমিরাত। দেশটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য ভবিষ্যতের কাজের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মেধাবীদের আকর্ষণ করা।

২০২৬ সালের এক গবেষণাতেও আমিরাতের শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ার চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-দক্ষতা চাওয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রায় ২ হাজার ৭০০টি বেড়েছে।

এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও একটি সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও কম্পিউটার ব্যবস্থা বিশ্লেষণে দক্ষ তরুণদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। কর্মীদের দক্ষতার ধরন বদলাতে হবে। স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি উচ্চদক্ষ প্রযুক্তিকর্মী তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু কত মানুষ বিদেশে পাঠানো হবে, তা নয়। আগামী দশকে বিশ্ব শ্রমবাজারে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে, সেই অনুযায়ী দেশের তরুণদের কীভাবে প্রস্তুত করা হবে—এটিও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তির পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করা গেলে বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ধরনও বদলাতে পারে। স্বল্পদক্ষ শ্রমনির্ভর অভিবাসনের পাশাপাশি দক্ষ পেশাজীবী রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির এই পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনাতেও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতি তৈরি করা জরুরি।

কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু শ্রমিকের সংখ্যায় হবে না। প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা, প্রযুক্তি জ্ঞান ও উৎপাদনশীলতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *