ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে চলছে অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ চঞ্চলের একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘মুক্তির সংগ্রামে অনুভবের বৈভব’। প্রদর্শনীতে শিল্পীর সাম্প্রতিক সময়ের ৩৫টির বেশি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে শিল্পী মুক্তি, সংগ্রাম, স্মৃতি, মানবিক মর্যাদা ও ব্যক্তির অন্তর্গত অনুভূতিকে বিমূর্ত ভাষায় প্রকাশ করেছেন।
প্রদর্শনীটি ৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। শিল্পী অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ চঞ্চল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন এবং সিরামিক বিভাগের চেয়ারম্যান। সিরামিক শিল্প, গবেষণা ও শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিত্রকলাতেও কাজ করছেন।
প্রদর্শনীর কাজগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সরাসরি বর্ণনা নেই। বরং ঘটনা মানুষের মনে যে অভিঘাত তৈরি করে, শিল্পী তা রং, রেখা, পৃষ্ঠ ও আকৃতির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে এই ভাবনাটি এসেছে ‘ঘটনার অন্তর্গত অনুভূতির পুনর্জন্ম’ হিসেবে।
প্রদর্শনীতে উষ্ণ মাটির রঙের পাশাপাশি লাল, নীল, টিল, বেগুনি, কালো ও সাদা রঙের ব্যবহার চোখে পড়ে। বাদামি, অকর, কমলা ও মরিচা রঙে মাটি, ইতিহাস ও মানবিক উষ্ণতার আবহ তৈরি হয়েছে। তীব্র লাল রঙে এসেছে ক্রোধ, যন্ত্রণা, সংগ্রাম ও জীবনের শক্তির ইঙ্গিত। অন্যদিকে নীল ও টিল রঙে বিষাদ, গভীরতা ও নীরবতার আবহ তৈরি হয়েছে।
শিল্পীর সিরামিক ও মৃৎশিল্পের অভিজ্ঞতার প্রভাবও তাঁর চিত্রকর্মে স্পষ্ট। ক্যানভাসের পৃষ্ঠে স্তর, ঘর্ষণ ও গভীর টেক্সচার তৈরি করতে তিনি নানা ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ফলে ছবির পৃষ্ঠ শুধু দেখার বিষয় হয়ে থাকেনি। সেখানে স্পর্শ ও অভিজ্ঞতার অনুভূতিও তৈরি হয়েছে।
প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য বাংলা লিপির ব্যবহার। কয়েকটি চিত্রে বাংলা অক্ষরকে সরাসরি লেখার ভাষা হিসেবে নয়, বরং দৃশ্যমান শিল্প-উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও ঘন অক্ষরের স্তর, কোথাও অনুভূমিক রেখার মতো লিপির বিন্যাস। এতে ভাষা ও ছবির সীমানা একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে।
মানব মুখ ও অবয়বও প্রদর্শনীর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিছু কাজে মানুষের মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আবার কোথাও অবয়ব কেবল আভাস হিসেবে এসেছে। বিশেষ করে বড় আকারের কয়েকটি চিত্রে একক মানবমুখের সঙ্গে অসংখ্য রেখা ও আকৃতির সমাবেশ দেখা যায়। এতে ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্পর্কের একটি প্রতীকী পাঠ তৈরি হয়।
প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় ধারণা ‘মুক্তি’। তবে এখানে মুক্তি শুধু রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। মানুষের মর্যাদা, মৌলিক অধিকার, ন্যায়, স্বাধীনতা এবং আত্মমুক্তির আকাঙ্ক্ষাও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই একই চিত্রকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা কিংবা বৃহত্তর মানবিক আকাঙ্ক্ষার দৃষ্টিতে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
কাজগুলোর বিন্যাসেও শিল্পীর দীর্ঘ সময়ের অনুসন্ধান দেখা যায়। ছোট আকারের একাধিক চিত্র একসঙ্গে সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে মাঝারি ও বড় আকারের একক কাজ। কিছু চিত্রে কেন্দ্রীয় আকৃতি দর্শকের দৃষ্টি ধরে রাখে। অন্য কিছু কাজে অনুভূমিক স্তর তৈরি করে স্মৃতি, সময় ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
প্রদর্শনীর কাজগুলোতে সময়ের পরিবর্তনও লক্ষ করা যায়। আগের দিকের কিছু কাজে বিমূর্ততা ও শীতল রঙের প্রাধান্য বেশি। পরের দিকের কাজে মানব অবয়ব, তীব্র রঙ এবং বাংলা লিপির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হয়েছে। এতে শিল্পীর নিজস্ব ভাষার ক্রমবিকাশের একটি ধারণা পাওয়া যায়।
প্রদর্শনীটি শুধু শিল্পীর চিত্রকর্ম প্রদর্শনের উদ্যোগ নয়। এটি বিমূর্ত চিত্রকলার মাধ্যমে কীভাবে দেশ, মানুষ, ভাষা, স্মৃতি ও মুক্তির মতো বিষয়কে প্রকাশ করা যায়, সেই প্রশ্নও সামনে আনে। বিশেষ করে বাংলা লিপির ব্যবহার শিল্পীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও দৃশ্যচিন্তার মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি করেছে।
তবে প্রদর্শনীতে কিছু কাজের মধ্যে রূপ ও বিন্যাসের পুনরাবৃত্তিও চোখে পড়ে। ছোট আকারের কয়েকটি ধারাবাহিক কাজে একই ধরনের গঠন বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো শিল্পীর অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতা বোঝালেও সবগুলো কাজ একসঙ্গে প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
কাজগুলোর পাশে আরও বিস্তৃত পরিচিতি, নির্মাণকাল ও মাধ্যমের তথ্য থাকলে দর্শকের জন্য প্রদর্শনীটি বোঝা সহজ হতো। কারণ শিল্পীর ভাবনা অনেক ক্ষেত্রে দার্শনিক ও বিমূর্ত। সেই ভাবনার সঙ্গে দর্শকের সরাসরি সংযোগ তৈরিতে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক লেখা কার্যকর হতে পারত।
সব মিলিয়ে ‘মুক্তির সংগ্রামে অনুভবের বৈভব’ শিল্পী শেখ চঞ্চলের চিত্রভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর তুলে ধরেছে। সিরামিক শিল্পের পৃষ্ঠ ও টেক্সচারের অভিজ্ঞতা, বিমূর্ত রঙের ব্যবহার, বাংলা লিপি এবং মানব অবয়ব—সব মিলিয়ে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।
জয়নুল গ্যালারির এই প্রদর্শনী দর্শককে কোনো একটি নির্দিষ্ট অর্থ গ্রহণ করতে বাধ্য করে না। বরং নিজের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি দিয়ে ছবিগুলোকে পড়ার সুযোগ দেয়। সেই দিক থেকে প্রদর্শনীটি শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের পাশাপাশি সমকালীন বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি ও মানবিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভাবারও একটি পরিসর তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন: মানুষ, নদী আর কল্পনায় মাসুদ চৌধুরীর অন্য এক পৃথিবী