জাতীয় জাদুঘরের নলিনী কান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে চলছে ‘নদী ও পাখি’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা—ধরার আয়োজনে এ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন আলোকচিত্রী আবির আবদুল্লাহ ও আনসার উদ্দিন খান পাঠান। ৩রা অক্টোবর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে ৬ই অক্টোবর পর্যন্ত।
বাংলাদেশের নদী, পাখি, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের পরিবর্তনকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে প্রদর্শনীতে। দুই আলোকচিত্রীর কাজের বিষয় আলাদা হলেও মূল বক্তব্যে রয়েছে প্রকৃতি রক্ষার আহ্বান।
আনসার উদ্দিন খান পাঠান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পাখি নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর তোলা চার শতাধিক প্রজাতির পাখির ছবি থেকে নির্বাচিত ৮০টির বেশি আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। রঙিন ও বৈচিত্র্যময় পাখির পাশাপাশি জলচর ও বনাঞ্চলের পাখির জীবনও উঠে এসেছে তাঁর ছবিতে।
লাল সূর্যপাখি, নীলকণ্ঠ, কমলা-বাদামি বক, বেগুনি সূর্যপাখি, বড় ধনেশ, জলমুরগি এবং রঙিন জলচর পাখির নানা মুহূর্ত দেখা যায় তাঁর কাজে। কোথাও ফুলের ওপর বসে থাকা পাখি। কোথাও ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার মুহূর্ত। আবার কোথাও ছানাকে নিয়ে বিচরণ করছে মা পাখি।
পাঠানের ছবিতে পাখির সৌন্দর্যের পাশাপাশি তাদের আবাসস্থল ও অস্তিত্বের প্রশ্নও সামনে আসে। তাঁর দীর্ঘদিনের প্রকৃতি ও সংরক্ষণবিষয়ক কাজ ছবিগুলোকে শুধু সৌন্দর্য উপভোগের বিষয় হিসেবে রাখেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীববৈচিত্র্য রক্ষার বার্তা।
অন্যদিকে আবির আবদুল্লাহর ছবিতে নদী ও মানুষের সম্পর্কের নানা রূপ উঠে এসেছে। তাঁর আলোকচিত্রে নদী কখনো মানুষের জীবিকার উৎস। কখনো ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের অংশ। আবার কখনো উদ্বাস্তু মানুষের যাত্রাপথ। কোথাও নদী হয়ে উঠেছে পরিবেশ ধ্বংসের সাক্ষী।
ঢাকা ও বুড়িগঙ্গার বিস্তৃত দৃশ্য, সদরঘাটের নৌযানের ভিড়, নদীতে উল্টে থাকা নৌকা, বালু উত্তোলনের এলাকা এবং দূষিত পানির চিত্র প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে নজর কাড়ে। হাতিরঝিলের কালো পানিতে প্লাস্টিক সংগ্রহ করা শিশুর ছবিতে নগরায়নের বিপর্যয়, শিশুশ্রম, পরিবেশদূষণের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নৌযাত্রার ছবিতে নদী দেখা দিয়েছে পলায়নের পথ হিসেবে। আবার বিশ্ব ইজতেমার ছবিতে নদী মানুষের ধর্মীয় সমাবেশের পারিপার্শ্বিকতার অংশ। ঐতিহ্যবাহী নৌকা, বাঁশের সাঁকো এবং নদীতীরের মানুষের জীবনযাত্রার ছবিতে বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতির চিত্রও রয়েছে।
প্রদর্শনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দুই আলোকচিত্রীর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি অবস্থান। একদিকে পাখির ছবিগুলোতে আশা, সৌন্দর্য, এবং বিস্ময়; অন্যদিকে নদীর ছবিগুলোতে উদ্বেগ, ক্ষতি, এবং জরুরি অবস্থা। এই দ্বন্দ্বই প্রদর্শনীর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক — এটি দর্শককে শুধু দেখতে নয়, ভাবতে বাধ্য করে। আবির আবদুল্লাহ ও আনসার উদ্দিন খান পাঠানের কাজ একে অপরের পরিপূরক। পাঠানের পাখি দেখায় কী হারিয়ে যাচ্ছে; আবির দেখায় কেন হারিয়ে যাচ্ছে। এই সংলাপ প্রদর্শনীকে সাধারণ ফটো শো থেকে একটি পরিবেশ বিষয়ক জোরালো বার্তায় রূপান্তরিত করেছে।
প্রদর্শনীর ছবিগুলোয় আলো, রং ও দৃশ্য বিন্যাসেও রয়েছে বৈচিত্র্য। পাঠানের পাখির ছবিতে উজ্জ্বল প্রাকৃতিক রং এবং বিষয়ের স্পষ্টতা প্রধান হয়ে উঠেছে। আবিরের ছবিতে কখনো বাস্তবের কঠিন রং, কখনো ধূসর আলো ও কুয়াশা পরিবেশগত সংকটের আবহ তৈরি করেছে।
একটি বৃত্তাকার গ্যালারিতে প্রদর্শনীর ছবিগুলো সাজানো হয়েছে। পাখির ছবিগুলো বিভিন্ন ধরনের পাখির পরিচয় ও জীবনযাত্রার ভিত্তিতে স্থান পেয়েছে। নদী ও মানুষের সম্পর্কের ছবিগুলো একটি ধারাবাহিক গল্প তৈরি করেছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রদর্শনীর মূল ভাবনায় বাংলাদেশের নদী ও পাখির পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নদী বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনি বহু পাখির জীবনও নদী ও জলাভূমির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নদী ও জলাভূমির পরিবর্তন তাই পাখির আবাস ও খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রভাব ফেলে।
আবির আবদুল্লাহ আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় দীর্ঘদিনের পরিচিত নাম। ২০১৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র পুরস্কার লাভ করেন। আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। আনসার উদ্দিন খান পাঠান প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্যপ্রাণী ও পাখির আলোকচিত্র ধারণ করছেন। নেত্রকোনায় প্রকৃতি সংরক্ষণ নিয়েও তাঁর কাজ রয়েছে।
ধরার সদস্যসচিব শরীফ জামিল জানান, প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য শুধু পাখি ও নদীর ছবি প্রদর্শন নয়। মানুষের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা এবং নদী, জলাভূমি ও পাখির আবাসস্থল রক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোও এর লক্ষ্য।
সামগ্রিকভাবে ‘নদী ও পাখি’ প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোকচিত্রভিত্তিক উদ্যোগ। এখানে নদী শুধু একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়। এটি মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও সংকটের অংশ। একইভাবে পাখিকে রক্ষা করতে হলে তাদের আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে। আর জলাভূমি ও নদী রক্ষা করতে হলে মানুষের জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক নতুন করে ভাবতে হবে। প্রদর্শনীর আলোকচিত্রগুলো সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই দৃশ্যমান করে তুলেছে।
প্রদর্শনীটি তাই প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখানোর পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সামনে আনে। যে নদী ও জলাভূমি পাখিকে আশ্রয় দেয়, মানুষকে জীবন দেয়, সেই প্রকৃতি কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় শুধু পরিবেশকর্মীদের নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষেরও সম্পর্ক রয়েছে।