অন্তরের ছয় রিপু ও প্রকৃতির সংকট নিয়ে ড. আবু কালাম শামসুদ্দিনের শিল্পভাষ্য

আলিয়ঁস ফ্রঁসেসে ড. আবু কালাম শামসুদ্দিনের ‘যন্ত্রণার সুর: অরিষড়্বর্গ’ চিত্রপ্রদর্শনীর শিল্পকর্ম

মানুষের অন্তর্গত প্রবৃত্তি ও প্রকৃতির ওপর তার প্রভাবকে কেন্দ্র করে এক ভিন্নধর্মী শিল্পভাষ্য নিয়ে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেসে শুরু হয়েছে ড. আবু কালাম শামসুদ্দিনের একক চিত্রপ্রদর্শনী । সমসাময়িক বাংলাদেশী শিল্পচর্চায় দর্শন, মনোবিজ্ঞান এবং পরিবেশবাদের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে “দ্যা সং অব অ্যাগনি: অরিষড়বর্গ” একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। প্রদর্শনীটি কেবল ক্যানভাসের ওপর রঙের প্রয়োগ নয়, বরং এটি মানুষের ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং বাহ্যিক পরিবেশের ওপর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবের একটি গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান। কিউরেটর আকশাত সিনহা ও হরমন্দীপ সিং-এর যৌথ তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই প্রদর্শনীটি দর্শককে একটি সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে পরিণত করে।

প্রদর্শনীর মূল ভাবনা ভারতীয় দর্শনের অরিষড়্বর্গ বা ষড়রিপুকে ঘিরে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মৎসর—মানুষের এই ছয় প্রবৃত্তিকে শিল্পী ব্যক্তিমানুষের সীমায় রাখেননি। এগুলোর সঙ্গে সমাজ ও প্রকৃতির ওপর মানুষের ক্ষতিকর প্রভাবের সম্পর্কও অনুসন্ধান করেছেন।

শিল্পীর এই সংযোগস্থাপন অত্যন্ত যুগোপযোগী ও চিন্তাউদ্দীপক। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, মানুষের ভেতরের ‘মোহ’ বা ‘লোভ’ তাকে পরিবেশ ধ্বংস, বন উজাড় এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করার মতো কাজে প্ররোচিত করে। অর্থাৎ, মানুষের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা বা ‘অ্যাগনি’ কেবল তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তা বাইরের জগতেও এক ধ্বংসলীলার সৃষ্টি করে। এই ধারণা প্রদর্শনীটিকে একটি সাইকোলজিক্যাল আর্ট থেকে পরিবেশবাদী আর্টের পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

প্রদর্শনীর কাজগুলোতে প্রাচীন ভারতীয় শিল্পধারার প্রভাব রয়েছে। পাল যুগের ক্ষুদ্রচিত্র, অজন্তার গুহাচিত্র এবং থাংকা চিত্রকলার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থেকে শিল্পী অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। এসব ঐতিহ্যকে সরাসরি অনুকরণ না করে সমকালীন শিল্পভাষায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

তাঁর কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ক্যানভাসের পৃষ্ঠতল তৈরির কৌশল। বালি, কাদা, জিঙ্ক অক্সাইড, প্লাস্টিক এবং আঠা ব্যবহার করে তিনি যে টেক্সচার বা খসখসে পৃষ্ঠতল তৈরি করেন, তা দর্শকের মধ্যে এক অস্বস্তিকর কিন্তু বাস্তবসম্মত অনুভূতি জাগায়। এটি প্রকৃতির ক্ষত এবং মানুষের মানসিক অশান্তির দৃশ্যমান রূপ।

প্রদর্শনীতে সীমিত রঙের ব্যবহারও লক্ষণীয়। নীল, বাদামি, হলদে-সবুজ, অনুজ্জ্বল হলুদ এবং সোনালি রঙের বিভিন্ন মাত্রা কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। রঙের ব্যবহারে তিনি সুনির্দিষ্ট প্রতীকী অর্থ আরোপ করেছেন। নীল আত্মদর্শন ও সততার প্রতীক। বাদামি নিরাপত্তা ও স্বস্তির সঙ্গে যুক্ত। হলদে-সবুজ অসুস্থতা ও অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত বহন করে। অনুজ্জ্বল হলুদ সতর্কতা ও ঈর্ষার প্রতীক। সোনালি রঙ আধ্যাত্মিক পূর্ণতা এবং আত্মার উচ্চতর অবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রঙের এই বিশেষ ব্যবহার এবং ছবির গঠন দর্শককে এক স্বপ্নিল ও অলৌকিক জগতে নিয়ে যায়, যা শিল্পী আসলে তাঁর কাজের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন।”

প্রদর্শনীতে কেবল দ্বি মাত্রিক পেইন্টিং নয়, বরং ইনস্টলেশনের ব্যবহার দর্শককে গ্যালারির ভেতর দিয়ে সক্রিয়ভাবে ঘুরে বেড়াতে এবং শিল্পের সাথে সংযুক্ত হতে বাধ্য করে। শিল্পী এখানে দর্শককে কোনো উপদেশ দিচ্ছেন না, বরং তিনি নিজেও দর্শকের সাথে যাত্রা শুরু করেছেন নিজের ‘অন্তরের শত্রু’কে খোঁজার। এই গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনীটিকে সাধারণ আর্ট শো থেকে একটি ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগ বা সংলাপে রূপান্তরিত করেছে।

কিউরেটরদের দৃষ্টিতে শিল্পী এখানে একই সঙ্গে শিল্পী, শিক্ষক ও গবেষক। তাঁর শিল্পচর্চায় অনুসন্ধান ও গবেষণার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রদর্শনীতে তাই কোনো নির্দিষ্ট নৈতিক উপদেশ দেওয়ার বদলে দর্শককে নিজের ভেতরের প্রবৃত্তিগুলোর দিকে তাকানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রদর্শনী নিয়ে একটি প্রশ্নও থেকে যায়। ছয়টি পৃথক প্রবৃত্তিকে একই ধরনের আবহ, সীমিত রঙ এবং যন্ত্রণার সামগ্রিক অনুভূতির মধ্য দিয়ে কতটা স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে? কোনো কোনো দর্শকের কাছে লোভ, ক্রোধ বা ঈর্ষার মতো আলাদা প্রবৃত্তির প্রতীক শনাক্ত করা সহজ নাও হতে পারে। তবে শিল্পীর উদ্দেশ্য যদি হয় এই আবেগগুলোর সম্মিলিত ‘বিলাপ’ বা ‘অ্যাগনি’ দেখানো, তবে তিনি তা সফলভাবেই করেছেন।

“দ্যা সং অব অ্যাগনি: অরিষড়বর্গ” দর্শককে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। এটি আমাদের ভেতরের অন্ধকার দিকগুলোকে উন্মোচিত করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের মানসিক শুদ্ধতা না এলে বাইরের প্রকৃতি বাঁচানো সম্ভব নয়। ড. আবু কালাম শামসুদ্দিন তাঁর এই সিরিজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কেবল একজন চিত্রশিল্পী নন, বরং একজন দার্শনিক ও সমাজচিন্তক, যিনি তুলির আঁচড়ে আঁকছেন মানুষের অস্তিত্বের সংকট ও প্রকৃতির বিলাপের গান। এটি মানুষের ভেতরের প্রবৃত্তি, সামাজিক আচরণ এবং প্রকৃতির সংকটের মধ্যে একটি সম্পর্ক খোঁজার শিল্পপ্রয়াস। নিজের অন্তর্গত অস্থিরতার দিকে তাকিয়ে বাহ্যিক পৃথিবীর সংকটকে বোঝার একটি সুযোগ তৈরি করেছে এই প্রদর্শনী।

 

আরও পড়ুন: কৌতূহলের ভুবনে ফরাসি শিল্পী ফ্লাভিয়েঁ মার্তিনেল

One thought on “অন্তরের ছয় রিপু ও প্রকৃতির সংকট নিয়ে ড. আবু কালাম শামসুদ্দিনের শিল্পভাষ্য”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *