বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্কৃতি, প্রকৃতি, প্রাণী ও সমকালীন বিশ্বের নানা সংকটকে নিজের শিল্পভাবনায় ধারণ করেছেন ফরাসি শিল্পী ফ্লাভিয়েঁ মার্তিনেল। ঢাকায় আলিয়স ফ্রঁসেসে আয়োজিত তাঁর একক প্রদর্শনী ‘কৌতূহলের ভুবন’-এ স্থান পেয়েছে ৩০টি শিল্পকর্ম। এসব কাজে ভ্রমণ, পর্যবেক্ষণ, আবেগ, সামাজিক সচেতনতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নানা স্তর উঠে এসেছে।
প্রদর্শনীর সঙ্গে প্রকাশিত শিল্পীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, তাঁর কাজগুলো কোনো পূর্বপরিকল্পিত ধারাবাহিকতার অংশ নয়। সংবাদ, পথের কুকুর, অধরা পাখি কিংবা একঘেয়েমির মতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকেও তাঁর কাজের সূত্রপাত হয়েছে। ফলে প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলোতে একই সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও বহির্জগতের প্রতি শিল্পীর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
প্রদর্শনীর একটি বড় অংশে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় উঠে এসেছে। মৃত্যুদণ্ড, উদার দাসত্ব, যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি, যুদ্ধবন্দী এবং তেলদূষণ নিয়ে করা কাজগুলোতে সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের প্রতি শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে ‘কালো জোয়ার’ শিরোনামের কাজটি পরিবেশদূষণের বিষয়টি সামনে আনে। ‘উদার দাসত্ব’ আধুনিক সমাজে স্বাধীনতা ও নির্ভরতার মধ্যকার বৈপরীত্য নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতিও শিল্পীর আগ্রহের বিষয় হয়েছে। ‘বাংলা চোখ’ শিরোনামের কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। ‘তার প্রয়োজনের কাছাকাছি’ নামের কাজটি ফরাসি আলোকচিত্রী মার্ক রিবুর একটি আলোকচিত্র থেকে অনুপ্রাণিত। এ ছাড়া ভারতের কেরালার ইদুক্কি অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ এবং ফরাসি কৃষক ও দার্শনিক পিয়ের রাবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের কাজও রয়েছে প্রদর্শনীতে।
প্রকৃতি ও প্রাণীও মার্তিনেলের শিল্পচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘পথের কুকুর ভালোবাসা ছড়ায়’, ‘প্রকৃতিই ঘর’ এবং ‘শেরু’ নামের কাজগুলোতে প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি ফুটে উঠেছে। শিল্পীর বক্তব্যেও পথ চলার সময় কুকুরের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসার কথা উঠে এসেছে। এতে বোঝা যায়, তাঁর কাছে পথের অভিজ্ঞতা শুধু দৃশ্যগত বিষয় নয়; তা আবেগেরও উৎস।
প্রদর্শনীর আরেকটি অংশে রয়েছে স্বপ্নময় ও বিমূর্ত কল্পনা। ‘মেঘের ওপরে’, ‘আলবাটর’, ‘হিমধস’, ‘শক্তির গোলক’, ‘অসীম লুপ’, ‘হিমায়িত’ ও ‘লাফ’—এ ধরনের কাজের মাধ্যমে শিল্পী তাঁর অন্তর্লোক, শক্তি, গতি ও আবেগকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছেন।
মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রদর্শনীতে রয়েছে বৈচিত্র্য। আটটি কাজে ইন্ডিগো নীলের ব্যবহার রয়েছে। এর কয়েকটি করা হয়েছে কাঠ বা গাছের আঁশমুক্ত বিশেষ কাগজে। এতে পরিবেশের প্রতি শিল্পীর সচেতনতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রদর্শনীর ১৬টি কাজে জলরং প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো কোনো কাজে এর সঙ্গে কালি-কলম, রঙিন পেন্সিল ও স্প্রে রঙ যুক্ত হয়েছে। ‘অনুতপ্ত’, ‘লাফ’ ও ‘হিমায়িত’ কাজে স্প্রে রঙের ব্যবহার জলরঙের কোমলতার বিপরীতে অপেক্ষাকৃত তীব্র আবহ তৈরি করেছে।
দুটি কাজে প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহারও রয়েছে। এর মধ্যে ইদুক্কি অঞ্চলের প্রাকৃতিক রঙের অভিজ্ঞতা এবং প্রকৃতিকে ঘর হিসেবে দেখার ভাবনা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
প্রদর্শনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বিষয়গত বিস্তৃতি। রাজনীতি থেকে প্রকৃতি, প্রাণী থেকে সংস্কৃতি, পরিবেশ থেকে ব্যক্তিগত অনুভূতি—বিভিন্ন বিষয় একই পরিসরে এসেছে। এতে প্রদর্শনীটি বৈচিত্র্যময় হয়েছে। তবে একই কারণে এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বিষয়গত ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।
প্রদর্শনীর নাম ‘কৌতূহলের ভুবন’ও সেই বিস্তৃতির ইঙ্গিত দেয়। কৌতূহল এখানে কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়নি। বরং শিল্পীর ভ্রমণ ও জীবন-অভিজ্ঞতার নানা বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত এর উপাদান হয়েছে। একইভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করা দুটি কাজের ভাবগত সাদৃশ্যও প্রদর্শনীর কিছু অংশে পুনরাবৃত্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
তবে এই বিচ্ছিন্নতাই প্রদর্শনীটির একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবেও দেখা যায়। কারণ শিল্পীর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি জটিল কৌশলের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ততাকে মিলিয়ে কাজ করেছেন। ফলে ৩০টি শিল্পকর্মকে একটি নির্দিষ্ট কাহিনির ধারাবাহিক অধ্যায় হিসেবে দেখার বদলে একজন ভ্রমণকারী শিল্পীর মানসিক অভিজ্ঞতার বিভিন্ন মুহূর্ত হিসেবে দেখা যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদেশি একজন শিল্পীর স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে দেখার দৃষ্টিও প্রদর্শনীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘বাংলা চোখ’ কিংবা পথের কুকুরকে ঘিরে করা কাজগুলো সেই পর্যবেক্ষণের উদাহরণ। একই সঙ্গে এসব কাজ একজন বাইরের মানুষের চোখে বাংলাদেশের দৃশ্য ও অভিজ্ঞতাকে দেখার সুযোগ তৈরি করে।
সব মিলিয়ে ‘কৌতূহলের ভুবন’কে একটি নির্দিষ্ট শিল্পভাবনার প্রদর্শনীর চেয়ে একজন ভ্রমণকারী শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দৃশ্যমান দিনলিপি হিসেবে দেখা যায়। এখানে কৌতূহল যেমন আছে, তেমনি আছে ক্ষোভ, মমতা, বিস্ময় ও প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ। আন্তঃসাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষণ এবং স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পচর্চার কারণে প্রদর্শনীটি দর্শকের জন্য ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
আরও পড়ুন: অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান জাদুঘরে বাংলাদেশি শিল্পকলার নতুন অধ্যায়