অস্ট্রেলিয়ায় জন্মহার কমে যাওয়া ও জনসংখ্যার দ্রুত বার্ধক্য আগামী কয়েক দশকে দেশটির অর্থনীতি ও সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। দেশটির সরকারের সর্বশেষ দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, ২০৬০-এর দশকে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ায় জন্মের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার ট্রেজারি বিভাগের ২০২৬ সালের আন্তঃপ্রজন্ম প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৪০ বছরে দেশটির জনসংখ্যা গড়ে বছরে ০.৯ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এর আগের ৪০ বছরে গড় বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.৪ শতাংশ। তবে অভিবাসনের কারণে মোট জনসংখ্যা ২০৬৫-৬৬ অর্থবছর নাগাদ প্রায় ৩ কোটি ৯৩ লাখে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার জনমিতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ কমে যাওয়া জন্মহার। দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট প্রজনন হার ছিল নারীপ্রতি ১.৪৮১ সন্তান। প্রতিস্থাপন পর্যায়ে জনসংখ্যা ধরে রাখতে সাধারণভাবে প্রায় ২.১ সন্তান প্রয়োজন বলে ধরা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় এই হার ১৯৭৬ সাল থেকেই প্রতিস্থাপন পর্যায়ের নিচে রয়েছে।
ট্রেজারির নতুন দীর্ঘমেয়াদি হিসাব অনুযায়ী, ২০৬৫-৬৬ নাগাদ প্রজনন হার আরও কমে নারীপ্রতি প্রায় ১.৩৪ সন্তানে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে ৮৫ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়ে ১৯ লাখে পৌঁছাতে পারে।
ফলে দেশটির জনসংখ্যার বয়স কাঠামোও উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যাবে। ২০৬৬ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মধ্যম বয়স প্রায় ৪৫ বছরে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ বছর। ৬৫ বছরের বেশি মানুষের সংখ্যা কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠীর তুলনায় দ্রুত বাড়বে।
জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হয়ে গেলেও অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে কমে যাবে না। এর প্রধান কারণ হবে বিদেশ থেকে মানুষের আগমন। ট্রেজারির হিসাব অনুযায়ী, অভিবাসন আগামী দশকগুলোতেও দেশটির জনসংখ্যা ও কর্মশক্তি বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে থাকবে।
এ কারণে অভিবাসন নীতি দেশটির জনমিতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। একই সময়ে অভিবাসনের মাত্রা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসন কমানোর দাবিতে ওয়ান নেশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির চাপের মধ্যে সরকার অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
তবে অভিবাসন কমে গেলে জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধির ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি প্রতিবেদনের হিসাবেও অভিবাসন ভবিষ্যৎ কর্মক্ষম জনসংখ্যা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যসেবার চাহিদাও বাড়বে। সরকারি প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী ৪০ বছরে নতুন স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
অন্যদিকে কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় অবসরপ্রাপ্ত ও বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়লে করের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় বহনের চাপও বাড়বে। অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো জনমিতিক পূর্বাভাসের তুলনায় নতুন প্রতিবেদনে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০৬৬ সালের মধ্যে প্রতি ১০০ কর্মক্ষম মানুষের বিপরীতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৯-এ পৌঁছাতে পারে, যেখানে বর্তমানে এই অনুপাত প্রায় ২৯।
স্বাস্থ্য ও বার্ধক্যসেবা খাতেও এর প্রভাব পড়বে। এসব খাতে কর্মী চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি অভিবাসী শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
জনসংখ্যার পরিবর্তন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। ২০২৬ সালের আন্তঃপ্রজন্ম প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জ্বালানি রূপান্তর, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং অর্থনীতির শিল্প কাঠামোর পরিবর্তনকে আগামী চার দশকের গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতা, কর্মশক্তি, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং নীতিগত পরিবর্তনের ওপর।
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান জনমিতিক পরিস্থিতি অবশ্য এখনো জনসংখ্যা হ্রাসের পর্যায়ে পৌঁছেনি। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে এক বছরে প্রায় ৩ লাখ জন্ম এবং ১ লাখ ৮৮ হাজার ৪০০ মৃত্যু নিবন্ধিত হয়েছিল। একই সময়ে বিদেশ থেকে অভিবাসনও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
তবে সরকারি দীর্ঘমেয়াদি হিসাব একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—আগামী দশকগুলোতে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা বৃদ্ধির বড় অংশ নির্ভর করবে অভিবাসনের ওপর, যখন জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধান ক্রমেই সংকুচিত হবে।
এই পরিবর্তনের ফলে স্বাস্থ্যসেবা, বার্ধক্যসেবা, শ্রমবাজার, সরকারি অর্থায়ন এবং অভিবাসন নীতিকে একই সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। ২০৬০-এর দশকে জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি হওয়ার পূর্বাভাস তাই শুধু জনসংখ্যার পরিসংখ্যানের পরিবর্তন নয়; এটি অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিকল্পনার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।