রোমে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক সম্মেলনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, ‘ওয়ান হেলথ’কে শুধু নীতিগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এটিকে বাস্তব কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতি দেখা দেওয়ার পর শুধু প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে ঝুঁকি আগেই শনাক্ত, প্রশমন ও প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মঙ্গলবার (২২শে সেপ্টেম্বর) ইতালির রাজধানী রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সদর দপ্তরের প্লেনারি হলে আয়োজিত এক অধিবেশনে মূল বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনের বিষয় ছিল জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি ও মোকাবিলা থেকে সহনশীল কৃষিখাদ্য ব্যবস্থা এবং টেকসই জীবিকা গড়ে তোলা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২১ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বরের বৈশ্বিক সম্মেলনে কৃষি, মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনেও আবদুল আউয়াল মিন্টু অংশ নেন।
মন্ত্রী বলেন, মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং প্রতিবেশ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া ঝুঁকি দ্রুত অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের খাদ্য ও জীবিকা ব্যবস্থা কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের অবক্ষয় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি নতুন নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তাই এসব বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
আবদুল আউয়াল মিন্টুর ভাষ্য, ওয়ান হেলথ শুধু স্বাস্থ্য খাতের কোনো কর্মসূচি নয়। এটি স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, পরিবেশের স্থায়িত্ব, খাদ্যনিরাপত্তা, সহনশীল জীবিকা এবং টেকসই উন্নয়নকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের নেওয়া উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১২ সালে জাতীয় ওয়ান হেলথ কৌশলগত কাঠামো গ্রহণ করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তৃতীয় ওয়ান হেলথ কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওয়ান হেলথ সচিবালয় তথ্য বিনিময়, সহযোগিতা ও সমন্বিত পদক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
কৌশলগত কাঠামোটিতে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বৃহত্তর পরিবেশের স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এতে সংক্রামক রোগ, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো রোগ, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা, জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠা এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, প্রস্তুতি কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। পরিবর্তনশীল ঝুঁকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।
এ জন্য সমন্বিত নজরদারি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি জৈব নিরাপত্তা, পরীক্ষাগার এবং মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলেন। রোগের উদ্ভবের পেছনে পরিবেশগত, প্রতিবেশগত ও আর্থসামাজিক কারণগুলো আরও গভীরভাবে বোঝার প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জলবায়ু সহনশীলতাকে স্বাস্থ্য সহনশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন পরিবেশমন্ত্রী। জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি, প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানকে ওয়ান হেলথের অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বর্তমান বিশ্বের জরুরি পরিস্থিতির ঝুঁকি কোনো একটি দেশের জাতীয় সীমার মধ্যে আটকে থাকে না। তাই কার্যকর প্রস্তুতির জন্য পুরো সরকারব্যবস্থার সমন্বয়, বিভিন্ন খাতের সহযোগিতা এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন।
তিনি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সহযোগিতার প্রশংসা করেন। মহামারি প্রতিরোধ ও প্রস্তুতির সঙ্গে সহনশীল কৃষিখাদ্য ব্যবস্থা, টেকসই জীবিকা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে একসূত্রে যুক্ত করার আহ্বান জানান।
মন্ত্রী দেশভিত্তিক সমাধান ও জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় উদ্যোগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে ওয়ান হেলথের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নীতিকে কার্যক্রমে এবং কার্যক্রমকে পরিমাপযোগ্য ফলে রূপ দিতে তিনি সব অংশীদারকে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
অধিবেশনে নাইজেরিয়ার পশুসম্পদমন্ত্রী ইদি মুখতার মাইহা, রোমে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক মিনিস্টার-কনস্যুলার ডগলাস হোয়েলশার, থাইল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সোপন আইআমসিরিথাওয়র্ন এবং ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার পরিচালক মেমদুহ উনাল অংশ নেন।
এ সময় ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ টি এম রকিবুল হকসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের নতুন কৌশলগত কাঠামোতে ওয়ান হেলথ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, বিভিন্ন খাতের সমন্বয় জোরদার করা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।