“এন এপল ট্রি ইনসাইড দ্য হেড” — একটি অপ্রকাশিত চলচ্চিত্রের দৃশ্যকাব্য

ফজলে রাব্বি মৃধার চলচ্চিত্রের ফ্রেম নিয়ে আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

“এন এপল ট্রি ইনসাইড দ্য হেড” সাধারণ কোনো ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী নয়, এটি মূলত একটি -মুক্তি না পাওয়া ফিচার ফিল্মের “জীবন্ত দেহাবশেষ”। পরিচালক ফজলে রাব্বি মৃধা যখন দেখলেন যে তাঁর চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়ন প্রচলিত সেন্সরশিপের সীমারেখা পার করতে পারছে না, তখন তিনি চলচ্চিত্রের ফ্রেমগুলোকেই শিল্পকর্ম হিসেবে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন, যা দর্শককে সরাসরি সিনেমার জগতে টেনে নিয়ে যায়।  এই সিদ্ধান্তটি প্রদর্শনীকে একটি মেটা-ন্যারেটিভ প্রদান করেছে— “নিষিদ্ধ ফল” বা অ্যাডাম-ইভের গল্পের সাথে মিল রেখে চলচ্চিত্রটি নিজেই একটি “নিষিদ্ধ ফল” হয়ে উঠেছে যা দর্শক এখন প্রদর্শনীতে গিয়ে “ভোগ” করছেন।

গ্যালারিতে পা রাখলেই মনে হয় এক রহস্যময় ও স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করা গেছে। বেশিরভাগ ছবিই সাদাকালো কিংবা পুরনো আমলের সেপিয়া রঙের, যা দর্শককে বর্তমান সময়ের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক অমীমাংসিত অতীতে নিয়ে ফেলে। প্রদর্শনীতে রয়েছে একটি হাতে ধরা আপেলের ছবি—যা আমাদের আদিম মানব-মানবী অ্যাডাম ও ইভের সেই বিখ্যাত আপেল, প্রলোভন আর জ্ঞানের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেন যে ছবিটি সেন্সরের কারণে আড়ালে রয়ে গেছে, সেটিই এখানে এক “নিষিদ্ধ ফল” হয়ে দর্শকের সামনে ধরা দিয়েছে। নদী, শুকিয়ে যাওয়া ডালপালা আর নির্জন প্রান্তর মিলিয়ে পুরো পরিবেশ জুড়ে এক ধরনের মনখারাপ আর গভীর নীরবতা ছড়িয়ে আছে।

শুধু দেয়ালে টাঙানো ছবিতেই এই গল্প শেষ হয় না; গ্যালারির মাঝখানে চোখে পড়ে একটি শুকনো গাছের ডাল, যা একটি লোহার চেয়ারের ওপর থেকে বেড়ে উঠেছে। গাছের ডালের ফাঁকে ঝুলছে একটি লাল আপেল। এই ইনস্টলেশনটি যেন পুরো প্রদর্শনীর হৃদয়। চেয়ারের ওপর রাখা একটি ছোট্ট খেলনা এক্সকেভেটর এবং মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা পাথরের মতো আকৃতিগুলো এক অদ্ভুত স্বপ্নলোকের ইঙ্গিত দেয়। মনে হয়, যেন ধ্বংসের ভেতর থেকেই প্রকৃতি বা মানব মনের গভীরে কোনো এক গাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এই দৃশ্যটি দর্শককে সাথে সাথেই চলচ্চিত্রের সেই জগতে নিয়ে যায়, যেখানে বাস্তব এবং কল্পনার সীমানা অস্পষ্ট।

দেয়াল ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করলে চোখে পড়ে সেপিয়া এবং ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টোনে তোলা অসংখ্য ফ্রেম। প্রতিটি ছবি যেন একেকটি কবিতা। একদিকে নদীর বুকে জেগে ওঠা শুকনো গাছ, অন্যদিকে গ্রাম বাংলার খড়ের ঘর। কিন্তু এই গ্রামীণ দৃশ্যে কোনো সাধারণ জীবন নেই; বরং আছে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। এক ছবিতে দেখা যায়, একজন পুরুষ নদীর ওপর ঝুকে থাকা গাছের ডালে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোথাও হারিয়ে যেতে চাইছে। প্রতিটি ফ্রেমেই যেন ফুটে উঠেছে একাকীত্ব, বিষাদ ও কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ভয়। আলো আর ছায়ার তীব্র ব্যবহারে প্রতিটি চরিত্রই নাটকীয় রূপ নিয়েছে, যা দর্শককে কেবল ছবি দেখার সুযোগ দেয় না, বরং সিনেমার ভেতরের সেই বিষাদময় অনুভূতিগুলোকে নিজে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে।

গ্যালারির এক কোণে দেয়াল থেকে ঝুলে পড়া একটি লাল শাড়ি দর্শকের পথ আটকে দাঁড়ায়। এটি যেন চলচ্চিত্রের ভেতরের জগত এবং বাইরের জগতের মাঝখানে একটি পর্দা। এই পর্দার ওপাশে হয়তো লুকিয়ে আছে সেই সব গল্প, যা বলা হয়নি, যা অকথিত থেকে গেছে। প্রদর্শনীটি দর্শককে আহ্বান জানায় এই পর্দা সরিয়ে ভেতরের জগতে প্রবেশ করতে।

“মাথার ভেতর আপেল গাছ” প্রদর্শনীটি কেবল ছবির সমাহার নয়, এটি একটি মানসিক যাত্রা। ফজলে রাব্বি মৃধা তার চলচ্চিত্রের ফ্রেমগুলোকে ব্যবহার করে যে জগত তৈরি করেছেন, তা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে—আমাদের মাথার ভেতরও কি এমন কোনো গাছ নেই, যার ডালে ঝুলে আছে আমাদের নিজস্ব কোনো নিষিদ্ধ ফল? এই প্রদর্শনী প্রমাণ করে যে, শিল্প কখনোই থেমে থাকে না; বরং তা নতুন রূপে, নতুন মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে চলে। দর্শক যখন গ্যালারি থেকে বেরিয়ে আসে, তার মনে তখনো ভাসতে থাকে সেই নদী, সেই শুকনো গাছ এবং সেই অদেখা আপেলের রহস্য।

পুরো গল্পটি না জানা থাকলে কিছু দৃশ্যের মূল অর্থ বুঝতে যদিও সাধারণ দর্শকের হয়তো একটু থমকে যেতে হয়, তবুও এই আয়োজনের আসল সার্থকতা এখানেই। “মাথার ভেতর আপেল গাছ” প্রমাণ করে দেয় যে সিনেমা বন্ধ হয়ে গেলেও শিল্পকে কখনো আটকে রাখা যায় না; তা নতুন রূপ নিয়ে মানুষের মনের দরজায় কড়া নাড়বেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *