গণব্যায়াম: সুস্থ শরীরের পাশাপাশি সামাজিক বন্ধন তৈরির পথ

গণব্যায়াম কর্মসূচিতে প্রশিক্ষকের নির্দেশনায় শরীরচর্চা করছেন অংশগ্রহণকারীরা

শহুরে জীবনে মানুষের চলাফেরা কমছে। কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, যানবাহনের ওপর নির্ভরতা এবং অবসর কাটানোর ধরন বদলে যাওয়ায় দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রমও কমেছে। এর সঙ্গে বাড়ছে নানা ধরনের দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং মানসিক চাপ।

এই বাস্তবতায় ব্যায়াম শুধু শরীর সুস্থ রাখার বিষয় নয়। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড পরিবার, সামাজিক যোগাযোগ এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যখন ব্যায়াম ব্যক্তিগত ঘরের বাইরে এসে গণপরিসরে করা হয়, তখন এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক অংশগ্রহণের একটি নতুন মাত্রা।

সম্প্রতি ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি গণব্যায়াম সম্মেলনে এমন বিষয়গুলোই উঠে এসেছে। আয়োজনে নারী, তরুণ, শিশু, প্রশিক্ষক ও ক্রীড়া সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে গণব্যায়ামের সম্ভাব্য ভূমিকার কথা।

সাকেজ শহর থেকে সম্মেলনে অংশ নেওয়া এক নারী বলেন, ব্যায়ামের মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের পাশাপাশি পরিবারের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও উদাহরণ তৈরি করতে পারেন। তাঁর মতে, নারীদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক নারী গৃহস্থালির কাজ ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য আলাদা সময় বের করতে পারেন না।

তিনি বলেন, জনপরিসরে একসঙ্গে ব্যায়াম করা স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার সহজ একটি উপায়। এতে নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও তৈরি হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র রোগ ও কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। এটি উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সংস্থাটির পরামর্শ অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্কের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করা উচিত। যারা বেশি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করেন, তাঁদের জন্য সপ্তাহে ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিটও উপকারী হতে পারে।

সাকেজের ক্রীড়া প্রশিক্ষক রহমান মাহমুদীর মতে, আধুনিক জীবন মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে। আগে দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই মানুষের অনেকটা শারীরিক পরিশ্রম হয়ে যেত। এখন যাতায়াত থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র ও বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই যন্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে শরীরচর্চার জন্য আলাদা সময় বের করার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

মাহমুদী বলেন, নিজের বা পরিবারের স্বাস্থ্যের জন্য ব্যায়াম শুরু করতে অন্য কারও আহ্বানের অপেক্ষা করা উচিত নয়। শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য নিয়মিত খেলাধুলা বা ব্যায়ামকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা দরকার।

তাঁর মতে, সামাজিক সমস্যার ক্ষেত্রেও সচেতনতা ও পারস্পরিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করা সামাজিক নানা ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

ক্রীড়া প্রশিক্ষক শোলেহ হাদি মনে করেন, নারীদের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের প্রভাব পরিবারের ওপরও পড়ে।তাঁর মতে, একজন মা যখন সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকেন, তখন সন্তানদের মধ্যেও তার ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে। মায়েরা নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও সেই অভ্যাস অনুসরণ করতে পারেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি গণব্যায়ামকে শুধু ব্যক্তিগত শরীরচর্চার জায়গায় আটকে রাখে না। বরং পরিবারকে একসঙ্গে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাসে যুক্ত করার একটি সুযোগ তৈরি করে।

গণব্যায়ামের আরেকটি দিক সামনে এসেছে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের বক্তব্যে। মোহাম্মদ নামে ওই কিশোর জানায়, গ্রীষ্মকালে সে প্রতিদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ক্রীড়া কেন্দ্রে যায়। সমবয়সীদের পাশাপাশি বয়স্কদের সঙ্গে ব্যায়াম করতেও তার ভালো লাগে।

তার ভাষ্য, পরিবারের সদস্য ও ক্রীড়া দলের সঙ্গে সময় কাটানোর কারণে মুঠোফোন ও খেলায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার সুযোগ কমে। একই সঙ্গে পড়াশোনা ও নিজের উন্নতির প্রতিও আগ্রহ বাড়ে।

এই অভিজ্ঞতা তরুণদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা ও গণব্যায়ামের জন্য আকর্ষণীয় জনপরিসর তৈরি করা যায় কি না। কারণ তরুণদের শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ শুধু মাঠ বা ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

কুর্দিস্তানের কোরভেহ কাউন্টির গণ ক্রীড়া গোষ্ঠীর পরিচালক জালাল আকবরী মনে করেন, গণব্যায়ামের সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে। তিনি আসক্তি, অপরাধপ্রবণতা, ঋণ ও বিবাহবিচ্ছেদের মতো বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, মানুষকে নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখার উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ কাজে ক্রীড়া কার্যক্রমের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় দরকার।

তবে এখানে একটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। ব্যায়াম করলেই কোনো সমাজের আসক্তি, অপরাধ বা বিবাহবিচ্ছেদের মতো জটিল সমস্যা কমে যাবে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো প্রমাণ নেই। এসব সমস্যার পেছনে অর্থনীতি, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিবেশসহ বহু কারণ কাজ করে।

তবে নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে পারে—এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে।

কুর্দিস্তান প্রদেশের গণ ক্রীড়া বোর্ডের প্রধান সাসান আসাদি গণব্যায়ামকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার তুলনামূলক কম ব্যয়ের একটি উপায় হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে বয়স্কদের নিয়মিত হাঁটা ও সহজ ব্যায়ামের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড হৃদ্‌রোগ, বহুমূত্র রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যও দেখায়, অপর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। শারীরিকভাবে কম সক্রিয় মানুষের অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।

তাই ব্যায়ামকে শুধু চিকিৎসার পরামর্শ হিসেবে না দেখে রোগ প্রতিরোধের অংশ হিসেবেও দেখা যায়।

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নিয়মিত শরীরচর্চার সুযোগ তৈরি করা সহজ নয়। খেলার মাঠ কমছে, হাঁটার উপযোগী জায়গা সীমিত এবং অনেক এলাকার ফুটপাতও হাঁটার জন্য নিরাপদ নয়। তার ওপর দীর্ঘ যানজট ও কর্মব্যস্ততা মানুষের অবসর সময় আরও সংকুচিত করে।

এই বাস্তবতায় গণব্যায়ামের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বড় ক্রীড়া স্থাপনা সব জায়গায় তৈরি করা সম্ভব না হলেও পার্ক, খেলার মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্মুক্ত জায়গা কিংবা নির্দিষ্ট সড়কের অংশকে নির্দিষ্ট সময়ে শরীরচর্চার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

সকালের হাঁটা, দলগত ব্যায়াম, নারী ও বয়স্কদের জন্য আলাদা শরীরচর্চার আয়োজন কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিয়মিত খেলাধুলার ব্যবস্থা—এসব উদ্যোগ তুলনামূলক কম খরচে করা সম্ভব।

এর জন্য শুধু ক্রীড়া সংগঠন নয়, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং পরিবারগুলোকেও যুক্ত হতে হবে।

শেষ পর্যন্ত গণব্যায়ামের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হয়তো এখানেই—এটি মানুষকে শুধু নিজের শরীরের দিকে তাকাতে শেখায় না, একই সঙ্গে নিজের পরিবার ও চারপাশের মানুষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে নয়। মানুষ যাতে অসুস্থ হওয়ার আগেই নিজের শরীর ও জীবনযাপনের যত্ন নিতে পারে, সেই পরিবেশও তৈরি করতে হয়। গণব্যায়াম সেই পরিবেশ তৈরির একটি সহজ ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের পথ হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *