ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির সঙ্গে বৈঠকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের বিষয়ে সংস্থাটির সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার (১৭ই সেপ্টেম্বর) অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সদর দপ্তরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সংস্থাটির মহাপরিচালকের এ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।
বৈঠকে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পাশাপাশি পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার সম্প্রসারণ, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা জোরদার এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচিতে কারিগরি সমস্যার কারণে বিলম্বের কথা জানিয়েছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। জ্বালানি ভরার কাজ শুরু হওয়ার পর প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। তবে ভালভ-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে সেই প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়।
এর আগে ১৪ই সেপ্টেম্বর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভের সঙ্গেও বৈঠক করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। ওই বৈঠকে রূপপুর প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তার মান বজায় রেখে কাজ এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভিয়েনার বৈঠকে ফকির মাহবুব আনাম পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির ভূমিকার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য, পানি ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে উপকৃত হচ্ছে। সম্প্রতি ২০২৬ থেকে ২০৩২ মেয়াদের দেশভিত্তিক সহযোগিতা কাঠামো স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে আগামী বছরগুলোতে কারিগরি সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি ভরার মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পারমাণবিক বর্জ্য ও ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আন্তর্জাতিক যৌথ সনদে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির কথাও তিনি তুলে ধরেন।
বৈঠকে ক্যানসার চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ‘আশার আলো’ উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ২০২৫ সালে এ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় দেশে একটি সমন্বিত এককেন্দ্রিক ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণে দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্ঞান বিনিময় এবং টেকসই চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কারিগরি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এ সহযোগিতাকে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ দিতে সংস্থাটির সঙ্গে কাজ করছে।
নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ পর্যালোচনা মিশনের প্রতিও আগ্রহের কথা জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এ মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন এবং চিকিৎসাব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে।
বৈঠকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করতে হবে।
তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বৃত্তি এবং যৌথ গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বৈঠকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, ভিয়েনায় নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত তৌফিক হাসান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম. মঈনুল ইসলাম এবং যুগ্মসচিব শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।