সংস্কারের পর নতুন করে চালু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা। রোববার (১৩ই সেপ্টেম্বর) ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করা হয়। সেখানে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে।
তবে সংস্কারের পর সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত হওয়া এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ছবি না থাকার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন।
বর্তমান সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি রয়েছে। এর একটি ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের সময়ের ছবি। ওই বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
আরেকটি ছবি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন, যেখানে জিন্নাহর ছবি রয়েছে।
ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমার ভাষ্য, জিন্নাহকে ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপনের জন্য এসব ছবি রাখা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সময়ের ঘটনাবলির অংশ হিসেবে ছবিগুলো রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, সংগ্রহশালায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ ও ছয় দফাসহ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কিছু উপাদানও রয়েছে।
তবে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি দেখা যায়নি বলে জানানো হয়েছে। সেখানে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলের বিয়ের একটি ছবি এবং তাঁর ছবি সংবলিত তিনটি সংবাদপত্রের কাটিং রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের একটি খোদাইচিত্রেও বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি রয়েছে।
সংগ্রহশালার ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের অংশে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি, শহীদদের ছবি এবং ভাষা আন্দোলনের সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবি রাখা হয়েছে। রয়েছে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার উল্লেখ।
মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য, শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবিও রয়েছে।
তবে সংবাদমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদনে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সংগীতা ইমাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা শুধু ছবি প্রদর্শনের স্থান নয়। এটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
উদীচীর বক্তব্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালায় কোন ছবি থাকবে এবং কোন ঘটনাকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সংগঠনটি মনে করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে যথাযথ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা জরুরি।
একই সঙ্গে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে তার সম্পর্কও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করে সংগঠনটি। তাই জিন্নাহ বা অন্য কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছবি রাখা নিজে সমস্যার বিষয় নয়। বরং সেই ছবি কোন প্রেক্ষাপটে এবং কোন ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্যে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
উদীচী সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত ছবি ও দলিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং তথ্যসূত্র নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটি ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস যথাযথ গুরুত্বে উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে। বঙ্গবন্ধুসহ স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাবলির দলিল যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণের কথাও বলা হয়েছে।
ভবিষ্যতে সংগ্রহশালার সংস্কার ও কিউরেশনের ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে উদীচী।
এ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে তথ্য, দলিল, গবেষণা এবং বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক স্মৃতির উন্মুক্ত শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে সংগ্রহশালাটি গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে ১৪ই সেপ্টেম্বর প্রতিবাদ জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। তারা ছবিগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছে।
এর মধ্যেই উর্দু বিভাগের আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে এক শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় থাকা জিন্নাহর তিনটি ছবির ফ্রেম ভাঙেন এবং ছবি ছিঁড়ে ফেলেন।
অন্যদিকে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ জিন্নাহর ছবি রাখার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছবিগুলো ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়কে তুলে ধরার জন্য রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, জিন্নাহ যে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছিলেন, সেই ইতিহাসও সংগ্রহশালায় দেখানো হয়েছে।
একটি ঐতিহাসিক সংগ্রহশালার দায়িত্ব শুধু পছন্দের ছবি বেছে নেওয়া নয়। একই সঙ্গে তার কাজ হলো সংশ্লিষ্ট সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্কটি তুলে ধরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ গভীরভাবে যুক্ত। একইভাবে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসও বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। তাই কোনো একটি ছবি রাখা বা বাদ দেওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পুরো ঘটনাপ্রবাহ কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ডাকসু সংগ্রহশালাকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্নও তাই—কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে সামনে আনা হচ্ছে কি না, নাকি বিভিন্ন সময়ের ঘটনাকে যথাযথ প্রেক্ষাপট ও তথ্যসূত্রসহ তুলে ধরা হচ্ছে।
ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়ও সংগ্রহশালায় থাকতে পারে। তবে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য, প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও থাকা প্রয়োজন। তাহলেই একটি সংগ্রহশালা রাজনৈতিক স্মৃতির পাশাপাশি গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।