চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনা ও আধুনিকায়নে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে কর্মকর্তারা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও আধুনিকায়নে বৈশ্বিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালটির আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।

ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন।

অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বাংলাদেশে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হামুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তির আওতায় প্রাথমিকভাবে ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। তবে টার্মিনালের জমি, মূল অবকাঠামো ও সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। শেষ পর্যন্ত এসব সম্পদের মালিকানা বাংলাদেশের সরকারের অধীনেই থাকবে।

চুক্তি সইয়ের সময় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এককালীন অর্থ দিতে হবে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করার কথা রয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রযুক্তি সংযোজন ও পরিচালন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।

এর বিনিময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের আয় বা রয়্যালটির একটি অংশ পাবে। গড় টার্মিনাল আয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতি কনটেইনারে এই অংশ প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে হবে। এর বাইরে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

চুক্তিতে বছরে কমপক্ষে ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এই ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউতে নামিয়ে আনার সুযোগ থাকবে।

সেবার মান নিশ্চিত করতে চুক্তিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মদক্ষতার সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাক চলাচলের সময় এবং ক্রেনের উৎপাদনশীলতার মতো বিষয় রয়েছে।

নির্ধারিত কর্মদক্ষতার লক্ষ্য টানা তিন মাস পূরণ করতে না পারলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা কার্যকর হবে।

টার্মিনালের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, নিরীক্ষা ও নিয়মিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কনটেইনার ও জাহাজ পরিচালনা, আয় এবং অন্যান্য পরিচালন সূচক নিয়ে সাপ্তাহিক ও মাসিক প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান কৌশলগত সম্পদগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতা দ্রুত বাড়ানো তিনি বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন পদ্ধতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ এনসিটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করবে। বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার মাধ্যমে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করা সরকারের বৃহত্তর নীতির অংশ বলেও জানান তিনি।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উৎপাদন অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের এই উন্নয়নে সহযোগিতা করতে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর ও সরবরাহ অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের যোগাযোগ আরও সহজ হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র ও বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই চুক্তি।

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি নির্দিষ্ট কনটেইনার পরিচালনা স্থাপনার একটি এনসিটি। ২০০৭ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এটি দেশের বাণিজ্য অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়।

তবে কনটেইনার পড়ে থাকার সময়, জাহাজের পণ্য ওঠানামা শেষ করে বন্দর ছাড়তে যে সময় লাগে এবং যন্ত্রপাতির কার্যকারিতার ক্ষেত্রে বন্দরটি এখনও নানা সমস্যার মুখে রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও এনসিটিতে একটি কনটেইনারের গড় অবস্থানের সময় নয় দিনের বেশি। সমপর্যায়ের কয়েকটি বন্দরে এই সময় দুই দিনেরও কম। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজের অবস্থানকাল আড়াই দিনের বেশি। কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের বন্দরে এই সময় ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ২০২৫ সালের কনটেইনার বন্দর কর্মদক্ষতা সূচকে বিশ্বের ৪০০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৩৬৪তম।

সরকারের হিসাবে, বন্দরের পরিচালনগত অদক্ষতা ও পর্যাপ্ত আধুনিকায়নের অভাবে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনার বন্দরে পড়ে থাকার সময় এক দিন কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে।

নতুন চুক্তির ফলে এনসিটির মালিকানা বা সার্বভৌম কর্তৃত্ব হস্তান্তর হবে না। নিরাপত্তা, শুল্ক ও অভিবাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলোর বর্তমান দায়িত্ব বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অধীনেই থাকবে। সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য দেশের ভেতরে সংরক্ষণ, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের পরিচয় ও পটভূমি যাচাইয়ের বিষয়েও সরকারি অনুমোদিত মানদণ্ড অনুযায়ী সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

স্থানীয় কর্মসংস্থানও অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকার-টু-সরকার নীতি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কাঠামোর আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রাক-যোগ্যতা যাচাই, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন বিষয়ে যাচাই-বাছাই ও আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৩শে মার্চ অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরপর ২০২৫ সালের ২০শে অক্টোবর লেনদেন কাঠামোসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুমোদিত হয়।

২০২৬ সালের ৮ই জানুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২৫শে জানুয়ারি দরপত্র জমা পড়ে। এরপর ২৭শে জানুয়ারি থেকে ৬ই আগস্ট পর্যন্ত আলোচনা চলে। ১৬ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড এ ব্যবস্থা অনুমোদন করে। পরে ১লা অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিও অনুমোদন দেয়।

এনসিটির নতুন পরিচালনা ব্যবস্থা চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের উন্নয়নকাজের সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নেওয়া হবে। ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি চালুর কথা রয়েছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ৮০টির বেশি সমুদ্র ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে বিশ্বের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ পরিচালিত হয়। ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

নতুন চুক্তির মূল লক্ষ্য এনসিটির পরিচালন দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। একই সঙ্গে কনটেইনার ও জাহাজের অবস্থানকাল কমিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়ানো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *