বেগুনি পাতার বোট লিলি, সৌন্দর্যের আড়ালে যে গুণগুলো

বাগানে বেড়ে ওঠা বোট লিলির লম্বা সবুজ ও গাঢ় বেগুনি পাতার ঝোপ।

মারুফ আহমেদ

বাগানের এক কোণে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা ছাদের টবে অনেক সময় দেখা যায় ঝোপালো এক ধরনের পাতাবাহার। লম্বা সবুজ পাতার নিচের অংশ গাঢ় বেগুনি। দেখতে আকর্ষণীয় এই উদ্ভিদের নাম বোট লিলি। এর স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নাম ট্রেডেস্ক্যানশিয়া স্পাথাসিয়া। রোইও স্পাথাসিয়া নামটিও এর পুরোনো নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ভিদটির আদি নিবাস মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চল থেকে গুয়াতেমালা পর্যন্ত। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণ অঞ্চলে এটি চাষ করা হয়।

বোট লিলি সাধারণত দলবদ্ধভাবে বেড়ে ওঠে। এর কাণ্ড খাটো ও শক্ত। পাতাগুলো লম্বা, সরু এবং গোড়ার দিকে ঘনভাবে সাজানো থাকে। পাতার ওপরের দিক সবুজ হলেও নিচের অংশে থাকে চোখে পড়ার মতো বেগুনি রংয়ের নৌকার মতো আবরণ। এই বৈশিষ্ট্য থেকেই উদ্ভিদটির নামের সঙ্গে নৌকার ধারণাটি যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে অনেক জায়গায় গাছটি খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। শিকড়ের গোড়া ভাগ করে কিংবা কাণ্ডের অংশ থেকে নতুন গাছ তৈরি করা যায়। যত্নও তুলনামূলক সহজ। অতিরিক্ত পানি বরং এর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। মাঝারি আলো থেকে আংশিক ছায়াতেও এটি ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। খরা সহ্য করার ক্ষমতাও রয়েছে।

তবে বোট লিলিকে শুধু সৌন্দর্যের গাছ হিসেবে দেখলে এর আরেকটি দিক আড়ালে থেকে যায়। উদ্ভিদটি নিয়ে বিভিন্ন দেশে ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় নানা ব্যবহার রয়েছে। কাশি, সর্দি, শ্বাসতন্ত্রের কিছু সমস্যা, জ্বর এবং প্রদাহের মতো সমস্যায় এর পাতা ব্যবহারের প্রচলনের কথা উদ্ভিদবিষয়ক গবেষণায় পাওয়া যায়। তবে এসব ব্যবহারকে আধুনিক চিকিৎসায় প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

বোট লিলির পাতা নিয়ে গবেষণায় আরও কিছু সম্ভাবনাময় তথ্য পাওয়া গেছে। পাতার জলীয় নির্যাসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও জীবাণুরোধী কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় পাতার নির্যাসে বিভিন্ন ফেনলজাত ও ফ্ল্যাভোনয়েডজাত যৌগ শনাক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষায় এসব নির্যাসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতাও দেখা গেছে।

আরেকটি গবেষণায় বোট লিলির পাতার নির্যাস বিভিন্ন ছত্রাকের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা দেখিয়েছে। তবে গবেষণাটি পরীক্ষাগারে করা হয়েছে। মানুষের শরীরে একই ফল পাওয়া যাবে—এমন সিদ্ধান্ত সেখান থেকে নেওয়া যায় না। ফলে গাছটির ঔষধি সম্ভাবনা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

শ্বাসতন্ত্র ও হজমের সমস্যায় বোট লিলির প্রচলিত ব্যবহারের পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খোঁজার কাজও চলছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এর নির্যাস নিয়ে পরীক্ষাগারে এবং প্রাণীর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে অন্ত্রের খিঁচুনি কমানো এবং শ্বাসনালির প্রসারণের সম্ভাব্য কার্যকারিতা দেখা গেছে। কিন্তু এসব ফলকে মানুষের চিকিৎসায় সরাসরি প্রয়োগযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা এখনো ঠিক হবে না।

বোট লিলিকে ঘরের বাতাস পরিশোধনকারী উদ্ভিদ হিসেবেও অনেকে উল্লেখ করেন। তবে ফর্মালডিহাইড বা বেঞ্জিনের মতো দূষক ঘরের বাতাস থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দূর করার বিষয়ে এই নির্দিষ্ট উদ্ভিদের কার্যকারিতার শক্ত প্রমাণ সীমিত। তাই একে ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ রাখার নিশ্চিত সমাধান বলা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ হবে না। ঘরের সৌন্দর্য ও সবুজ পরিবেশ তৈরিতে এর ভূমিকা অবশ্যই রয়েছে।

বোট লিলির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর নিরাপত্তা। গাছটির রস ত্বকে লাগলে কিছু মানুষের জ্বালা, চুলকানি বা প্রদাহ হতে পারে। চোখে গেলেও অস্বস্তি হতে পারে। কাঁচা পাতা খাওয়াও নিরাপদ নয়। বেশি পরিমাণে খেলে মুখ, গলা ও পাকস্থলীতে অস্বস্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহারের কথা থাকলেও নিজের ইচ্ছায় পাতার রস বা নির্যাস খাওয়া উচিত নয়।

অর্থাৎ, অবহেলায় পড়ে থাকা একটি বেগুনি পাতাবাহারকে শুধু আগাছা বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এটি একই সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন, সহজে বংশবিস্তারকারী এবং গবেষণার দৃষ্টিতে সম্ভাবনাময় একটি উদ্ভিদ। এর পাতায় থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক উপাদান নিয়ে ইতোমধ্যে গবেষণা হয়েছে। আবার এর কিছু ঐতিহ্যগত ব্যবহার বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করার চেষ্টাও চলছে।

তবে বোট লিলির প্রকৃত গুরুত্ব বুঝতে হলে সৌন্দর্য, লোকজ ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখতে হবে। বাগান, ছাদ কিংবা বাড়ির আঙিনায় এর চাষ করা যেতে পারে। কিন্তু ঔষধি গুণের দাবিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে গাছটির রসের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি।

বেগুনি পাতার এই ছোট্ট উদ্ভিদ তাই কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয়। এর মধ্যে রয়েছে উদ্ভিদবিজ্ঞান, লোকজ জ্ঞান এবং আধুনিক গবেষণার মিলিত একটি গল্প। সেই গল্প যত বেশি গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হবে, বোট লিলির পরিচয়ও তত বেশি স্পষ্ট হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *