মাটির মায়ায় ঐতিহ্য ও সমকালীন শিল্পের গল্প

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়নুল গ্যালারিতে ‘মাটির মায়া’ সিরামিক প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম

মাটিকে শুধু নির্মাণের উপকরণ হিসেবে নয়, শিল্পের নিজস্ব ভাষা হিসেবে তুলে ধরেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সিরামিক বিভাগের ৭২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনী ‘মাটির মায়া’। ১লা অক্টোবর জয়নুল গ্যালারিতে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে প্রায় ৩৮টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনীতে টেরাকোটা, স্টোনওয়্যার, আর্থেনওয়্যার, রাকু গ্লেজ ও মিশ্র মাটির নানা ধরনের কাজ রয়েছে। শিল্পকর্মগুলোর বিষয়েও রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রকৃতি, মানুষ, মাতৃত্ব, অস্তিত্ব, লোকঐতিহ্য ও সমকালীন জীবনের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে এসব কাজে।

প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার। বেশির ভাগ কাজে মাটির লালচে-বাদামি ও খয়েরি রঙের প্রাধান্য দেখা যায়। কিছু কাজে অবশ্য গাঢ় ও উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার রয়েছে।

মাহবুব আলম হৃদয়ের ‘টিয়া’ তে গাঢ় নীল রঙের প্রলেপ বিশেষভাবে নজর কাড়ে। হিরন রায়ের ‘চিপসের প্যাকেট’ হাইপার-রিয়ালিস্টিক রঙিন গ্লেজিং, যা একটি সাধারণ চিপসের প্যাকেটকে অবিকল রূপ দিয়েছে। কাজটি সাধারণ একটি ভোগ্যপণ্যের প্যাকেটকে মৃৎশিল্পের মাধ্যমে বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরেছে। এটি শিল্প ও ভোগসংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়েও ভাবনার সুযোগ তৈরি করে।

তাহসিন তাবাসসুম ঐশীর ‘টেপা পুতুল’ ও ‘হাতি’ তে রাকু প্রলেপের ব্যবহার দেখা যায়। ফাটলধরা সাদা ও ধূসর পৃষ্ঠ এসব কাজকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির পুতুলের সঙ্গে সমকালীন নির্মাণকৌশলের এই সমন্বয় প্রদর্শনীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।

প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কও প্রদর্শনীতে বারবার ফিরে এসেছে। হৃষিক মজুমদারের ‘পঞ্চভূতের সুর’ শিরোনামে প্রকৃতির পাঁচ উপাদানের ধারণা উঠে এসেছে যা পঞ্চভূতের দার্শনিক ধারণাকে উপস্থাপন করে। সামিরা আলমের ‘পদ্ম-মেঘের ছাউ’ ও ‘বীজ-ভুবন’ এ পদ্ম ও বীজের মাধ্যমে জীবন ও প্রকৃতির ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত রয়েছে। আয়শা সিদ্দিকা উষার ‘আদিমা’ তে বৃত্তাকার কাঠামোর ভেতরে ক্ষুদ্র মানবমূর্তির বিন্যাস আদিম জীবন ও আবাসের ভাবনা সামনে আনে।

নারী ও মাতৃত্বও প্রদর্শনীর পুনরাবৃত্ত বিষয়। ‘মা ও ছেলে’ শিরোনামে মাতৃত্বের পরিচিত লোকজ রূপ দেখা যায়। গ্রামীণ নারীর একটি বড় উঁচু খোদাইচিত্রে মাথায় ঝুড়ি, হাতে পাখি, পদতলে হাতি — বাংলার মেয়েদের শক্তি, সৌন্দর্য ও প্রকৃতির সাথে একাত্মতার প্রতীক।

হিরন রায়ের ‘বিশ্বমাতা’ তে মাতৃত্বের একটি শক্তিশালী রূপ দেখা যায়। বিকৃত আকৃতির মাতৃমূর্তির মাধ্যমে কাজটি ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাইরে মাতৃত্বের সার্বজনীন ধারণার দিকে ইঙ্গিত করে। একই শিল্পীর ‘সন্দেহ সংগ্রহ’ কাজে দীর্ঘ গলা ও বিকৃত মুখের মানবমূর্তি দেখা যায়। এতে মানুষের অস্তিত্ব ও মানসিক দ্বন্দ্বের একটি বিমূর্ত প্রকাশ লক্ষ করা যায়।

মানবিক আবেগ ও অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে করা চারটি মুখের সিরিজটি প্রদর্শনীর সবচেয়ে দার্শনিক কাজ। ‘দেখি না মন্দ, শুনি না মন্দ, বলি না মন্দ’—পরিচিত এই ধারণাকে মাটির মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু চতুর্থ প্যানেলে একটি একক চোখ ও হাতের উপস্থিতি এই প্রবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

হৃষিক মজুমদারের ‘বিশ্বাসের আশ্রয়’ ও ‘অস্তিত্ব’ তেও গল্প বলার প্রবণতা স্পষ্ট। ময়ূর, পেঁচা, দেবীমূর্তি, গ্রামীণ দৃশ্য ও রথসহ বিভিন্ন উপাদান মিলিয়ে তিনি ছোট পরিসরে একটি পূর্ণাঙ্গ জগৎ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। একাধিক খণ্ডকে পাশাপাশি সাজিয়ে গল্প বলার আরেকটি প্রবণতা দেখা যায় তাঁর কয়েকটি কাজে।

বিশাল সাহার ‘ঐতিহ্যের বৃত্ত’সহ কয়েকটি বৃত্তাকার কাজের মধ্যে বাংলার পুরোনো অলংকরণধারার ছাপ রয়েছে। তাঁর ‘রূপ’ ও ‘আকার’ কাজে কাঠের শিরার মতো পৃষ্ঠ তৈরি করা হয়েছে। এতে মাটির পৃষ্ঠকে ভিন্নভাবে ব্যবহারের কারিগরি দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে।

আয়শা সিদ্দিকা উষার ‘ভাসমান’ কাজে জৈব ও প্রবাহমান আকৃতির ব্যবহার রয়েছে। রেজওয়ানা মল্লিক বর্ষার ‘শেওলাধরা চা-সেট’ একই সঙ্গে ব্যবহারিক ও নান্দনিক মৃৎশিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরে। তাঁর ‘মানবদেহের বিকৃতি’ তে মানবদেহের প্রচলিত আকৃতিকে ভেঙে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়।

প্রদর্শনীতে লোকশিল্পের সরলতা যেমন আছে, তেমনি আধুনিক বিমূর্ততা ও পরীক্ষামূলক নির্মাণও রয়েছে। গ্রামীণ নারীর উঁচু খোদাইচিত্র, ‘মা ও ছেলে’ এবং ‘বিশ্বাসের আশ্রয়’-এর মতো কাজে লোকধারার প্রভাব স্পষ্ট। অন্যদিকে খণ্ডিত আকৃতি, মাটির টাইলের মোজাইক, রাকু প্রলেপ ও বাস্তবধর্মী নির্মাণে সমকালীন শিল্পচর্চার প্রভাব দেখা যায়।

তবে প্রদর্শনীটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।  কিছু গাঢ় রঙের খোদাইচিত্রে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় সূক্ষ্ম কাজও পুরোপুরি স্পষ্ট হয় না।

কাজগুলোর বিন্যাসেও আরও সুস্পষ্ট বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনার সুযোগ ছিল। লোকধারা, প্রকৃতি, মানবদেহ, সমকালীন জীবন ও পরীক্ষামূলক কাজ আলাদা অংশে সাজানো হলে দর্শকের জন্য প্রদর্শনীর ভাবনা অনুসরণ করা সহজ হতে পারত। শিল্পীদের নিজস্ব বক্তব্য বা প্রদর্শনীর একটি ব্যাখ্যামূলক নোট থাকলেও দর্শকের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হতো।

তারপরও ‘মাটির মায়া’ একটি শিক্ষার্থী প্রদর্শনীর গণ্ডিতে আটকে নেই। একই উপাদান ব্যবহার করে ৭২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা ও নির্মাণভাষা হাজির করেছেন। কেউ ফিরে গেছেন লোকঐতিহ্যের কাছে, কেউ প্রকৃতি ও জীবনচক্রের দিকে তাকিয়েছেন। কেউ আবার মানুষের অস্তিত্ব, ভোগসংস্কৃতি ও সমকালীন জীবনের প্রশ্নকে মাটিতে রূপ দিয়েছেন।

‘মাটির মায়া’ তাই শুধু মৃৎশিল্পের প্রদর্শনী নয়। এটি মাটিকে ঘিরে বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পভাবনার একটি মিলনস্থল। জয়নুল গ্যালারিতে প্রদর্শিত প্রায় ৩৮টি কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছেন, একই মাটি থেকে তৈরি হলেও শিল্পের ভাষা একরকম হয় না। প্রত্যেক শিল্পী নিজের ভাবনা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই মাটিকে দিয়েছেন আলাদা রূপ।

 

আরও পড়ুন: রং, রেখা আর লিপিতে মুক্তির এক ভিন্ন অনুভব 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *