বাংলাদেশে বিপন্ন এশীয় হাতি, সংকটে বাসস্থান ও চলাচলের পথ

বাংলাদেশের বনে চলাচলরত এশীয় হাতির পাল

ড. মো: আব্দুল ওয়াহাব

বাংলাদেশে এশীয় হাতির অস্তিত্ব এখন গুরুতর সংকটে। বন উজাড়, আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়া, মানুষের বসতি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং হাতি-মানুষ সংঘাত—সব মিলিয়ে দেশের বন্য হাতির জন্য নিরাপদ পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে হাতির সর্বশেষ বিস্তারিত জাতীয় জরিপ ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পরিচালিত হয়। ওই জরিপে দেশে গড়ে ২৬৮টি আবাসিক বন্য হাতি থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি প্রায় ৯৩টি পরিযায়ী হাতি বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করে এবং ৯৬টি বন্দী হাতির তথ্যও নথিভুক্ত হয়েছিল। তবে এসব সংখ্যা পুরোনো; ২০২৬ সাল পর্যন্ত নতুন পূর্ণাঙ্গ জাতীয় জরিপের ফল প্রকাশিত হয়নি। সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন হাতি জরিপ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে এশীয় হাতি মহাবিপন্ন শ্রেণিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এশীয় হাতি (Elephas maximus) আইইউসিএনের বৈশ্বিক লাল তালিকায় বিপন্ন শ্রেণিভুক্ত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে প্রজাতিটি সিআইটিইএস-এর প্রথম পরিশিষ্টে অন্তর্ভুক্ত।

দেশে হাতির প্রধান আবাস দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি বন। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনাঞ্চলে আবাসিক হাতির বড় অংশ রয়েছে। এ ছাড়া দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল—বিশেষ করে শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও আশপাশের এলাকায় ভারত থেকে পরিযায়ী হাতির চলাচল রয়েছে। ২০২৫ সালের এশীয় হাতি রেঞ্জ স্টেটস বৈঠকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হাতির প্রধান হুমকি হিসেবে আবাসস্থল ধ্বংস ও খণ্ডিত হওয়া, চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, খাদ্য ও পানির সংকট এবং হাতি-মানুষ সংঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের সব হাতিকে একই ধরনের স্থায়ী প্রাণী হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আবাসিক হাতির পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সংযুক্ত আন্তসীমান্ত চলাচলও গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৬ সালের আইইউসিএনভিত্তিক গবেষণায় দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে হাতির চলাচলের ১২টি করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছিল। একই গবেষণায় বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর হাতির চলাচলের ৫৭টি আন্তসীমান্ত সংযোগস্থলের তথ্যও নথিভুক্ত করা হয়।

হাতির জন্য বন শুধু থাকার জায়গা নয়; খাবার, পানি, প্রজনন এবং নিরাপদ চলাচলের জন্য তাদের বিস্তৃত ভূখণ্ড প্রয়োজন। সেই ভূখণ্ডে মানুষের বসতি, কৃষি, সড়ক, রেলপথ ও অন্যান্য অবকাঠামো ঢুকে পড়লে হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতির উদাহরণ রয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল তৈরির ফলে হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। আইইউসিএন ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ২০১৮ সাল থেকেই সেখানে হাতি-মানুষ সংঘাত কমাতে হাতি প্রতিক্রিয়া দল, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও করিডোর চিহ্নিত করার কাজ করেছে।

সাম্প্রতিক তথ্যেও কক্সবাজারের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বন বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে আটটি হাতি করিডোরের মধ্যে পাঁচটি উখিয়া ও টেকনাফে; রোহিঙ্গা শিবির স্থাপনের পর উখিয়ার কুতুপালং এলাকায় তিনটি করিডোর দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত রয়েছে।

তবে হাতির আবাসস্থল সংকটের কারণ শুধু রোহিঙ্গা শিবির নয়। বনভূমিতে বসতি, কৃষি সম্প্রসারণ, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ, একক প্রজাতির বাগান এবং অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও হাতির আবাসস্থল খণ্ডিত করছে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক পর্যালোচনায়ও এসব বিষয়কে বাংলাদেশের হাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাতির চলাচলের পথ যখন মানুষের বসতি বা কৃষিজমির মধ্যে ঢুকে পড়ে, তখন সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ে। ধান বা অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হলে কৃষক হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদসহ প্রাণঘাতী পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশের বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ১৪৬টি হাতি মারা গেছে। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই তথ্য উল্লেখ করে বলেন, হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া, বন উজাড়, খাদ্যসংকট, সড়ক-রেলপথ নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদ হাতি-মানুষ সংঘাত বাড়াচ্ছে।

শেরপুরেও বৈদ্যুতিক ফাঁদে হাতি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের মার্চে নালিতাবাড়ীতে ধানক্ষেত রক্ষার জন্য স্থাপন করা বৈদ্যুতিক তারে একটি হাতি মারা যায়; এ ঘটনায় একজন কৃষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

এ পরিস্থিতিতে হাতি শুধু সংরক্ষণের বিষয় নয়; কৃষকের ফসল, স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা এবং বন ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি যুক্ত।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বনভূমির পরিমাণ থাকলেই হাতির জন্য উপযোগী আবাসস্থল নিশ্চিত হয় না।

হাতির প্রয়োজনীয় খাবার, পানি এবং এক আবাসস্থল থেকে অন্য আবাসস্থলে যাওয়ার নিরাপদ পথ থাকতে হয়। আইইউসিএনের গবেষণায় বাংলাদেশে হাতির আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়ার পেছনে বনভূমির অবক্ষয়, অনিয়ন্ত্রিত কৃষি সম্প্রসারণ, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ এবং একক প্রজাতির বনায়নের মতো বিষয় উঠে এসেছে।

এ কারণে শুধু নতুন গাছ লাগানো বা একটি বনাঞ্চলকে সবুজ দেখানো যথেষ্ট নয়। হাতির জন্য প্রয়োজন এমন বন, যেখানে খাদ্য ও পানির উৎস রয়েছে এবং যেখান থেকে তারা অন্য প্রয়োজনীয় আবাসস্থলে নিরাপদে যেতে পারে।

বাংলাদেশের হাতি সংরক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো বিদ্যমান হাতির চলাচলের পথগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সুরক্ষা দেওয়া। ২০১৬ সালের জাতীয় গবেষণায় চিহ্নিত ১২টি করিডোর এখনো সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৫ সালের এশীয় হাতি রেঞ্জ স্টেটস বৈঠকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব চলাচলের পথের পর্যাপ্ত আইনগত সুরক্ষা নেই এবং দখল ও খণ্ডিত হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।

এর পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তসীমান্ত হাতি চলাচল নিয়েও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাতির ক্ষেত্রে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ও চলাচলের পথ বন্ধ হওয়ার প্রভাব নিয়ে গবেষকেরা উদ্বেগ জানিয়েছেন।

কৃষকের ফসলের ক্ষতি হলে দ্রুত ও সহজ ক্ষতিপূরণ, সংঘাতপ্রবণ এলাকায় আগাম সতর্কতা, প্রশিক্ষিত হাতি প্রতিক্রিয়া দল এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও জরুরি।

বাংলাদেশে হাতির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর—দেশটি কি শুধু কিছু হাতিকে রক্ষা করতে পারবে, নাকি তাদের প্রয়োজনীয় বন, খাবার, পানি এবং চলাচলের পথসহ পুরো আবাসস্থল রক্ষা করতে পারবে?

হাতিকে বাঁচাতে তাই শুধু হাতিকে রক্ষা করলেই হবে না; হাতির পথটিও বাঁচাতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *