বাংলাদেশকে নদীর দেশ বলা হয়। এ দেশের ভূপ্রকৃতি, কৃষি, মৎস্য, জনবসতি ও জীবিকা গড়ে উঠেছে নদীকে ঘিরে। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো বিপুল পলি বহন করে নিয়ে আসে। সেই পলি জমে তৈরি হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। নদী তাই বাংলাদেশের কাছে শুধু জলধারা নয়। নদী এ দেশের ভূপ্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম ভিত্তি।
২৭শে সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে বিশ্ব নদী দিবস। নদীর প্রাকৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরা এবং নদী সংরক্ষণে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। এ বছরের আয়োজনে বাংলাদেশেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, দখল ও দূষণ রোধ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের নদীগুলোর নামের মধ্যেও ছড়িয়ে আছে এই ভূখণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতি। কোনো নদীর নাম ফুলকুমারী, কোনোটি ফকিরনী। কোথাও খেপা, পাগলা, লেংগা বা মাথাভাঙ্গা। কোথাও চিকনাইয়ের পাশে পেটকি। ধলার পাশে কালা।
কোনো নদীর নাম মধুমতি, আবার কোনো নদীর নাম বিষখালী। আছে বুড়ি, জুয়ান, লেংটা ও বোরকা। আছে জুড়ি ও মুহুরী। নদীর নামের ভেতর মানুষের কল্পনা, বিশ্বাস, ধর্ম, পেশা, ব্যক্তিনাম এবং স্থানীয় ইতিহাসের ছাপও পাওয়া যায়।
পান্ডব, বিষ্ণু, হরি, নারদ, হরিহর, মানস, রামচন্ডি, ভুবনেশ্বর, গদাই, নিতাই, শিব, ধলেশ্বরী, গভেশ্বরী, কাগেশ্বরী, সোমেশ্বরী, নাগেশ্বরী, যমুনেশ্বরী, ভাটেশ্বরী ও মুক্তেশ্বরীর মতো নাম নদীকে লোকজ বিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও যুক্ত করেছে।
আবার আড়িয়াল খাঁ, জলকদর খাঁ, মিনহাজ, মুসা খান ও ইসদার খানের মতো নাম মনে করিয়ে দেয় নদীর সঙ্গে মানুষের ইতিহাসের সম্পর্ক। পুটিমারী, সিংগিমারী, শোলমারী, চিতলমারী, ইলিশমারী, সাপমারা, খাসিমারা থেকে ঘোড়ামারা—নামগুলোতে ধরা পড়ে নদীঘেরা জনপদের জীবন ও ভাষা।
সুবচনী, প্রাণসায়র, ধানসিঁড়ি, মনু, পিয়াইন, যাদুকাটা, তালমা, কুহেলিয়া, বিজলী, ঘুঙুর, টংকাবতী, বংশী, পারুলী, লুভা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, রূপসা, মালঞ্চ, চিত্রা, মধুমতি ও লবঙ্গবতীর মতো নাম আবার নদীকে নিয়ে তৈরি করেছে আলাদা এক নান্দনিক জগৎ।
সরকারি বিভিন্ন তথ্যভান্ডারেও দেশের নদী ও জলসম্পদের বিস্তৃত তথ্য সংরক্ষিত আছে। পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার একটি সাম্প্রতিক নদী দূষণ পর্যবেক্ষণ প্রকল্পে ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীর দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালের একটি সমীক্ষায় শিল্প, পৌর ও প্লাস্টিক বর্জ্যে ৫৬টি নদী গুরুতরভাবে দূষিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
নদীর সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সংখ্যা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোথাও সাত শতাধিক নদ-নদীর কথা বলা হয়। কোথাও আবার শাখা-প্রশাখা ও বিভিন্ন জলধারা যুক্ত করে সংখ্যা আরও বেশি ধরা হয়। বাস্তবে নদীর সংখ্যা নির্ধারণে সংজ্ঞা, উৎস ও শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্য রয়েছে।
সংখ্যার এই বিতর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নদীগুলো কতটা প্রবহমান এবং কতটা জীবন্ত। কারণ একটি নদীর অস্তিত্ব শুধু মানচিত্রে তার নাম থাকার ওপর নির্ভর করে না। নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে পানি প্রবাহ, পলি চলাচল, মাছের বিচরণ, তীরের উদ্ভিদ, জলাভূমি এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবন।
সাম্প্রতিক নদীবিষয়ক আলোচনাতেও নদীকে বিচ্ছিন্ন কোনো জলধারা হিসেবে না দেখে একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২৪শে সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত নদীবিষয়ক এক সংলাপে নদী ব্যবস্থাপনায় নীতি বাস্তবায়ন, অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
দেশের অনেক নদী দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, বর্জ্য ফেলা এবং নাব্যতা সংকটে রয়েছে। কোথাও নদীর তীর দখল করে স্থাপনা গড়ে উঠছে। কোথাও শিল্পবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। আবার কোথাও অতিরিক্ত পলি জমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
ঢাকার বুড়িগঙ্গা এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। তবে সংকট শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীও একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। নদী দূষণ পর্যবেক্ষণের জন্য পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা যে প্রকল্প পরিচালনা করছে, তার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর পানির গুণমান পর্যবেক্ষণ এবং দূষণের উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উপযোগী তথ্য তৈরি করা।
নদী নিয়ে মাঠপর্যায়ের কাজেও একই চিত্র উঠে এসেছে। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র, ঢাকার বুড়িগঙ্গা, পঞ্চগড়ের করতোয়া এবং খুলনার শৈলমারী নদীকে ঘিরে তরুণদের মাঠপর্যায়ের গবেষণায় নদী দখল, বালু উত্তোলন এবং নদী রক্ষায় স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
নদীর সংকটের সবচেয়ে কঠিন প্রকাশগুলোর একটি নদীভাঙন। একটি পরিবার যখন নদীতে বসতভিটা বা কৃষিজমি হারায়, তখন শুধু একটি সম্পদ হারায় না। বদলে যায় তার জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যমুনা নদীর তীরবর্তী ৩৬টি গ্রামের ১ হাজার ৫৯৪টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রায় ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী নদীভাঙনের প্রভাব হঠাৎ ঘটে যাওয়া স্বল্পমেয়াদি বন্যার তুলনায় মানুষের স্থায়ী অভিবাসনের আকাঙ্ক্ষায় বেশি প্রভাব ফেলে।
অর্থাৎ নদীভাঙনের অভিঘাত শুধু ঘরবাড়ি বা জমি হারানোর হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের ভবিষ্যৎ কোথায় হবে, সন্তানদের কোথায় বড় করা হবে এবং জীবিকা কীভাবে চলবে—এসব প্রশ্ন।
বাংলাদেশে নদী, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনের সঙ্গে মানুষের স্থানান্তরের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই ঝুঁকি আরও জটিল হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ২০২৫ সালের জাতীয় মূল্যায়নে দুর্যোগের কারণে দেশে আনুমানিক ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার ৫২৭ জন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের হিসাব পাওয়া যায়। এই মূল্যায়ন দেশের আটটি বিভাগ, ৬৪টি জেলা ও ১২টি সিটি করপোরেশনের বিস্তৃত এলাকায় পরিচালিত হয়।
এই সংখ্যার সবটাই নদীভাঙনের কারণে নয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগ এতে অন্তর্ভুক্ত। তবে নদীভাঙন ও বন্যা বাংলাদেশের দুর্যোগজনিত বাস্তুচ্যুতির গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
নদী রক্ষার প্রশ্ন তাই কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবিকা সরাসরি যুক্ত।
বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন আয়োজনে নদী দখল ও দূষণ বন্ধ করার পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষার দাবি উঠেছে। ঢাকায় দিবসটির এক অনুষ্ঠানে পানিসম্পদমন্ত্রীও নদী দখল ও দূষণ বন্ধ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
নদী রক্ষায় শুধু উচ্ছেদ অভিযান বা বিচ্ছিন্ন প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নদীর প্রবাহ, তীর, জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনকে একসঙ্গে বিবেচনা করা। প্রয়োজন নদীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এমন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা। প্রয়োজন স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি।
কারণ নদীকে রক্ষা করা মানে শুধু পানিকে রক্ষা করা নয়। এর অর্থ কৃষক, জেলে, নৌকার মাঝি, নদীতীরের বাসিন্দা এবং নদীনির্ভর অসংখ্য মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা।
বাংলাদেশের নদীগুলো শুধু দেশের মানচিত্রে আঁকা জলরেখা নয়। এসব নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনপদের ইতিহাস, মানুষের স্মৃতি, ভাষা, গান, জীবিকা ও সংস্কৃতি। নদী শুকিয়ে গেলে তাই শুধু একটি জলধারা হারায় না। হারিয়ে যায় একটি জনপদের জীবনেরও একটি অংশ।
বাংলাদেশ নদীর দেশ। এই দেশের মানুষও নদীর সঙ্গে গড়ে ওঠা এক সমাজের মানুষ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়া, দখল ও দূষণ বন্ধ করা এবং নদীর সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই হতে পারে নদী রক্ষার সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
নদী বাঁচলে পানি বাঁচবে। পানি বাঁচলে বাঁচবে কৃষি, প্রকৃতি, জীবিকা ও মানুষ। শেষ পর্যন্ত নদী বাঁচার প্রশ্নটি বাংলাদেশের বেঁচে থাকার প্রশ্নের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে।