ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে শীতের খরচ বাড়ার আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রে ঘর গরমের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও শীতকালীন বাড়তি ব্যয়ের প্রতীকী চিত্র।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ঘর গরমের জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে আসন্ন শীতে বিশেষ করে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েক লাখ পরিবারকে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।

পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ঘর গরমের তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এই জ্বালানি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এবং আলাস্কায় বেশি ব্যবহৃত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ শতাংশ পরিবার ঘর গরম করতে এই তেল ব্যবহার করে। এর ৮০ শতাংশের বেশি ব্যবহৃত হয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। ২০২৩-২৪ সালের শীত মৌসুমে প্রায় ৪৭ লাখ পরিবার ঘর গরমের প্রধান জ্বালানি হিসেবে তেল ব্যবহার করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর আগের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ঘর গরমের তেলের গড় দাম ছিল প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ১০ ডলার। এক মাসের মধ্যে তা ৩৫ শতাংশ বেড়ে ৫ দশমিক ৫৪ ডলারে ওঠে। এরপরও দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকে।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে পরিস্থিতি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ১৪ই  সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে সেখানে ঘর গরমের তেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ১৪ ডলারে পৌঁছায়। এক বছর আগে একই সময়ে দাম ছিল ৩ দশমিক ৭০ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রতি গ্যালনে দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৪৪ ডলার।

নিউইয়র্ক বন্দরের ঘর গরমের তেলের বাজারমূল্যও এ সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রতি গ্যালনের বাজারমূল্য প্রায় ৫ ডলারের কাছাকাছি ছিল। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের তুলনায় এটি বড় ধরনের বৃদ্ধি।

নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া বক্তব্যে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জ্বালানি সহায়তা নিয়ে কাজ করা জাতীয় সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক মার্ক উলফ বলেন, আসন্ন শীতে অনেক আমেরিকানকে বাড়তি ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রেও এই অতিরিক্ত ব্যয় পারিবারিক বাজেটে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে শুধু তেল ব্যবহারকারী পরিবারই নয়, অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও ঘর গরমের ব্যয় বাড়তে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর ওপরও জ্বালানির দামের চাপ পড়বে। তবে তেল ব্যবহারকারীদের তুলনায় তাদের ব্যয় বৃদ্ধির মাত্রা কম হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়ি ঘর গরমের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে। প্রায় ৪২ শতাংশ বাড়িতে ব্যবহার করা হয় তাপ পাম্প বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা। ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও আলাস্কার বাইরে থাকা অনেক পরিবারের ওপর ঘর গরমের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম পড়বে।

জ্বালানির উৎস পরিবর্তন করাও অনেক পরিবারের জন্য সহজ নয়। বৈদ্যুতিক তাপ পাম্প বসাতে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। আবার কোনো কোনো এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ পাওয়ার সুযোগও নেই। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লেও অনেক পরিবারকে বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হবে।

এদিকে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের পরিসংখ্যানেও নিউইয়র্ক বন্দরের ঘর গরমের তেলের বাজারমূল্যে গত কয়েক মাসে বড় ওঠানামা দেখা গেছে। আগস্টের শুরুতে প্রতি গ্যালনের দাম ৩ দশমিক ৭৭ ডলারের আশপাশে থাকলেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তা প্রায় ৫ ডলারে পৌঁছায়।

তবে আগামী মাসগুলোতে জ্বালানির কিছু দামের চাপ কমতে পারে। বাজার পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সরবরাহ এবং শীতের তীব্রতার ওপর চূড়ান্ত ব্যয় অনেকটাই নির্ভর করবে। এর মধ্যেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তেলনির্ভর পরিবারগুলোর সামনে শীত মৌসুমে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি সহায়তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। ফলে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা অপরিশোধিত তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়েও এর প্রভাব পড়ছে।

One thought on “ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে শীতের খরচ বাড়ার আশঙ্কা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *