ভোটার তালিকা হালনাগাদ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তালিকা ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সফটওয়্যারের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। শনিবার (২৬শে সেপ্টেম্বর) কমিশন জানিয়েছে, সফটওয়্যারটি দেশের নির্বাচনী আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা পরিবর্তন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তাঁর দুই সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন ও উদ্বেগ জানিয়েছেন—এমন প্রতিবেদন প্রকাশের পর কমিশন এই পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার তথ্যভান্ডারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, আপত্তিগুলোর মধ্যে ভোটার তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার এবং তালিকা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ও ছিল। দুই কমিশনারের অভিযোগের মধ্যে ভোটার তথ্যভান্ডার অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীয়করণের আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের অর্থ ভোটার তালিকায় ইচ্ছাকৃত কারসাজি হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। নির্বাচন কমিশন নিজেই জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয় এবং তাদের সব কার্যক্রম আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে ভারতের বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, তালিকা পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগও দাবি করেছে বিরোধী দলগুলো। রয়টার্স জানিয়েছে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ও তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছে এবং দাবি পূরণ না হলে ২রা অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে।
বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, একজন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কর্মকর্তার নেতৃত্বে এবং একজন স্বতন্ত্র প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সফটওয়্যার নির্বাচনী আইন ও বিধি মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, কমিটি তা পরীক্ষা করবে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডার ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কমিশনের দুই সদস্যের উদ্বেগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
ভোটার তালিকায় কোনো অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নিয়মিতভাবে সরকারি দপ্তরে হাজির করার পরিবর্তে স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের বাড়িতে গিয়ে যাচাই করার নির্দেশও দিয়েছে কমিশন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের লক্ষ্য ভোটারদের হয়রানি কমানো এবং যাচাই প্রক্রিয়াকে সহজ করা।
ভোটার তালিকা হালনাগাদের যে প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, বিহারে ২০২৫ সালের জুনে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া পরবর্তী সময়ে আরও রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সম্প্রসারিত হয়। তাদের প্রতিবেদনে ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া তালিকায় ১৩ কোটির বেশি নাম নিয়ে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটারদের তথ্য যাচাই এবং তালিকা থেকে বিভিন্ন নাম বাদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে কমিশনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে বলে সংবাদমাধ্যমটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন বলেছে, একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো আইন ও বিধি মেনেই নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সফটওয়্যার ব্যবস্থার পর্যালোচনা এবং ভোটারদের যাচাই প্রক্রিয়া সহজ করার পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে কমিশন।
এখন গঠিত কমিটির পর্যালোচনা এবং কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও অব্যাহত থাকতে পারে।