ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: যুদ্ধের আড়ালে কি বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক ক্ষমতার হিসাব?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক শক্তি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রভাবের প্রতীকী চিত্র

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতকে শুধু সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্যের একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। এই সংঘাত তেল, জ্বালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং পরাশক্তির সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের শক্তি, সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতা ধরে রাখার সীমাবদ্ধতা নিয়ে পুরোনো ঐতিহাসিক আলোচনাকেও সামনে আনছে।

ইতিহাসে বড় শক্তির পতন সাধারণত একটি নির্দিষ্ট দিনে শুরু হয়নি। রোমান সাম্রাজ্য, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক পরিবর্তন জমা হওয়ার পর বড় সংকট দৃশ্যমান হয়েছে।

ফরাসি চিন্তাবিদ শার্ল দ্য মঁতেস্কিয়ে রোমের উত্থান ও পতন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, একটি রাষ্ট্র যে উপাদানগুলোর ওপর নিজের শক্তি গড়ে তোলে, সময়ের সঙ্গে সেগুলোর কিছু আবার দুর্বলতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সাম্রাজ্যের বিস্তার বাড়লে সীমান্ত রক্ষা, প্রশাসন, করব্যবস্থা এবং সামরিক ব্যয়ের চাপও বাড়ে।

মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন রাষ্ট্র ও রাজবংশের উত্থান-পতন ব্যাখ্যায় সামাজিক সংহতি ও সম্মিলিত শক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্লেষণে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় উঠে আসে। পরবর্তী প্রজন্মে নিরাপত্তা ও সম্পদ উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া গেলে সেই কঠোর সামাজিক সংহতি দুর্বল হতে পারে।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি সভ্যতার বিকাশকে চ্যালেঞ্জ ও তার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর ধারণা অনুযায়ী, একটি সভ্যতার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ আসা অস্বাভাবিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন প্রতিক্রিয়া তৈরি করার ক্ষমতা।

রাষ্ট্রের শক্তি নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় মার্কিন ইতিহাসবিদ চার্লস টিলির গবেষণায়। তাঁর বিশ্লেষণে যুদ্ধ, করব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ পল কেনেডি বড় শক্তির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

এই ঐতিহাসিক ধারণাগুলো বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত বোঝার একটি কাঠামো দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র রোম বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের পুনরাবৃত্তি করছে। একইভাবে ইরানকে অতীতের কোনো সাম্রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করাও যথাযথ নয়।

বরং প্রশ্নটি হলো, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন দীর্ঘ সময় ধরে বৈশ্বিক দায়িত্ব, সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত প্রতিশ্রুতি বজায় রাখে, তখন তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয়ের পরিমাণ কতটা বাড়ে। একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলো সেই শক্তির সীমা পরীক্ষা করতে শুরু করলে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে।

এই জায়গায় ইরানের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ইরানি রাষ্ট্র ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত হলেও ইরানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস তার চেয়ে অনেক পুরোনো। পারস্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য, বিভিন্ন রাজবংশ, ইসলামি শাসন, সাফাভি যুগ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইরানি রাষ্ট্রীয় পরিচয় নানা রূপ নিয়েছে।

ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর। মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে দেশটি বহু শতাব্দী ধরে আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ইরান একই সঙ্গে বহু জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাভাষী মানুষের দেশ। পারসিকদের পাশাপাশি আজেরি, কুর্দি, আরব, বেলুচ, তুর্কমেনসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দেশটিতে বসবাস করে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছে।

এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বর্তমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কোনো সরকার পরিবর্তিত হলেই একটি দেশের ঐতিহাসিক পরিচয় বিলীন হয়ে যায় না। ইরানের ক্ষেত্রেও রাজতন্ত্রের পতন হয়েছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু ভূগোল, রাষ্ট্রীয় স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অনেক উপাদান টিকে রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভূগোল। ইরানের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, পর্বতময় এলাকা, দীর্ঘ উপকূল এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা সামরিক পরিকল্পনাকে জটিল করে তোলে। কোনো দেশের সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ভূগোল, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

পারস্য উপসাগরের গুরুত্ব এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই অঞ্চলের সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

তেলের মূল্য বৃদ্ধি অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। আবার সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে বাজারের প্রতিক্রিয়াও দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে কোনো সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করে তার ব্যাপ্তি, স্থায়িত্ব এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তার ওপর।

তবে বর্তমান সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব শুধু তেল বা সামরিক শক্তির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় শক্তির সক্ষমতা সম্পর্কে অন্য রাষ্ট্রগুলোর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাষ্ট্র কতটা সামরিক শক্তিশালী, তার পাশাপাশি অন্যরা সেই শক্তি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে বলে মনে করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি প্রতিদ্বন্দ্বী যদি মনে করে কোনো শক্তির প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকবে, তবে তার আচরণ বদলাতে পারে। কোনো মিত্র যদি মনে করে একটি সংঘাতে যুক্ত হওয়ার ব্যয় বেশি, তবে তার সিদ্ধান্তেও পরিবর্তন আসতে পারে। বাজারও প্রত্যাশার ভিত্তিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

এই কারণে একটি শক্তির সক্ষমতা কমে যাওয়ার জন্য সরাসরি সামরিক পরাজয় প্রয়োজন হয় না। অন্য রাষ্ট্রগুলো যদি তার সীমা পরীক্ষা করতে শুরু করে, তাতেও ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

ইতিহাসে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায় এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৪৫৩ সালে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের বাহিনী কনস্টান্টিনোপল দখল করে। কিন্তু শহরের পতন কেবল সেই অবরোধের ফল ছিল না। এর আগে বহু শতাব্দী ধরে বাইজেন্টাইন রাষ্ট্রের ভূখণ্ড, অর্থনৈতিক শক্তি ও জনশক্তি কমে গিয়েছিল।

উসমানীয় সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইউরোপে শিল্পায়ন, আধুনিক সামরিক ব্যবস্থা, রেলপথ, ব্যাংকিং এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশ বিশ্বশক্তির কাঠামো বদলে দেয়। উসমানীয় রাষ্ট্রকে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, যার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি আগের যুগের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কোনো রাষ্ট্র শুধু সামরিক পরাজয়ের কারণে দুর্বল হয় না। কখনও কখনও রাষ্ট্রের চারপাশের পৃথিবী এত দ্রুত বদলে যায় যে পুরোনো প্রতিষ্ঠান ও নীতির সঙ্গে নতুন বাস্তবতার ব্যবধান তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বর্তমান আলোচনার বিষয়টি এমন একটি প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়। দেশটি কি তার বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি, সামরিক ব্যয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক বৈধতার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়ার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তির অধিকারী। তার মিত্রজোট, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক উপস্থিতিও ব্যাপক।

অন্যদিকে ইরানও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। ফলে সংঘাতকে সরলভাবে শক্তিশালী বনাম দুর্বল রাষ্ট্রের লড়াই হিসেবে দেখা বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলবে।

বরং বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দীর্ঘস্থায়ী চাপের মধ্যে উভয় পক্ষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কতটা স্থিতিস্থাপক থাকে।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, সংঘাতের ফলে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান কীভাবে বদলায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা দেশও রয়েছে। একই সময়ে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তি অঞ্চলটির অর্থনীতি, কূটনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশটি বাদ পড়ে যায়।

বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, তথ্য, জ্বালানি ও সামরিক শক্তি পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কোনো একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করে না। আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বও শক্তির অংশ।

এ কারণে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো হয়তো অতীতের সাম্রাজ্যগুলোর মতো হবে না। একক কোনো শক্তির হাতে সব ধরনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকার পরিবর্তে একাধিক শক্তির মধ্যে ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

চীন, ভারত, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখছে। আরব দেশগুলোরও নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

এই পরিবর্তনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। তবে এর ফলাফলকে কোনো একটি দেশের অনিবার্য উত্থান বা অন্য কোনো দেশের নিশ্চিত পতন হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।

ইতিহাসের বড় শিক্ষা বরং অন্য জায়গায়। কোনো রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অস্ত্রভাণ্ডারে থাকে না। থাকে তার অর্থনৈতিক ভিত্তিতে, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতায়, জনগণের সংহতিতে, মিত্রদের আস্থায় এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন পথ তৈরি করার ক্ষমতায়।

রোম, কনস্টান্টিনোপল ও উসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসের মধ্যে এই বিষয়টি বিভিন্নভাবে দেখা যায়। একই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক: একটি রাষ্ট্র কত দূর পর্যন্ত তার দায়িত্ব ও ক্ষমতার পরিধি বাড়াতে পারে, এবং সেই বিস্তার কতটা ব্যয় বহন করার সক্ষমতা তৈরি করে?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ক্ষেত্রেও তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কেবল কে সামরিকভাবে বেশি শক্তিশালী, তা নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কোন পক্ষ তার অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান, জনসমর্থন, মিত্রতা ও কৌশলগত সক্ষমতা কতটা ধরে রাখতে পারে।

আরও বড় প্রশ্ন রয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ঘিরে। সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মিত্রদের আস্থা কীভাবে বদলাবে, ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান কীভাবে পরিবর্তিত হবে, জ্বালানি বাজার কতটা স্থিতিশীল থাকবে এবং অন্যান্য শক্তি এই পরিস্থিতিকে কীভাবে কাজে লাগাবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের দিক নির্দেশ করতে পারে।

সুতরাং বর্তমান সংঘাতকে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, হামলা, পাল্টা হামলা কিংবা তেলের দামের ওঠানামা দিয়ে বিচার করলে এর গভীরতর অর্থ ধরা কঠিন। সামরিক ঘটনাগুলো তাৎক্ষণিক খবর তৈরি করে। কিন্তু ইতিহাস খোঁজে সেই পরিবর্তনকে, যা মানুষের ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা বদলে দেয়।

কোনো সাম্রাজ্য বা পরাশক্তির দুর্বলতা সবসময় পতনের দৃশ্য দিয়ে শুরু হয় না। কখনও তা শুরু হয় অন্যদের আচরণ বদলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। কেউ তার সীমা পরীক্ষা করে। কেউ তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেউ বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এই পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে জমা হয়।

তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন হয়তো কে জিতল, তা নয়। বরং সংঘাতের পরে আন্তর্জাতিক শক্তির হিসাব কীভাবে বদলাল, সেটিই হতে পারে মূল বিষয়।

ইতিহাস ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। তবে ইতিহাস দেখায়, বড় পরিবর্তনের আগে প্রায়ই ছোট ছোট পরিবর্তন ঘটে। সেগুলো প্রথমে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয়। পরে দেখা যায়, সেগুলো একই পরিবর্তনের অংশ ছিল।

বর্তমান সংঘাতও শেষ পর্যন্ত এমন কোনো পরিবর্তনের সূচনা করছে কি না, তার উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, এর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও বিস্তৃত। জ্বালানি বাজার থেকে কূটনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য—সব ক্ষেত্রেই এর প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।

আর সেই কারণেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে শুধু একটি চলমান যুদ্ধ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একই সঙ্গে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের পরীক্ষা: পরিবর্তিত বিশ্বে দীর্ঘদিনের পরাশক্তি কতটা নিজের শক্তি ধরে রাখতে পারে এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সফলভাবে মানিয়ে নিতে পারে।

 

লেখক: রনি আলফা, লেবানিজ লেখক ও চিন্তাবিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *