ইস্পাত আর রেখায় অজানা রূপের সন্ধানে তৌফিকুর রহমান

তৌফিকুর রহমানের ‘রেখা-রূপ-ভারসাম্য’ প্রদর্শনীতে মৃদু ইস্পাতের বিমূর্ত ভাস্কর্য

 

সমসাময়িক ভাস্কর্যে নিজস্ব ভাষা নির্মাণের ধারাবাহিকতায় তৌফিকুর রহমান আয়োজন করেছেন তাঁর পঞ্চম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী ‘রেখা-রূপ-ভারসাম্য’। প্রদর্শনীতে ভাস্কর্যের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে কালি ও কয়লার আঁকা ছবি। দুটি মাধ্যমে ভিন্ন ধরনের কাজ হলেও তাদের ভাবনা ও নির্মাণপ্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

তৌফিকুর রহমানের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পরিচিত আকৃতিকে নতুনভাবে দেখা। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বিভিন্ন জৈব আকৃতি তাঁর কাজে কখনো আলাদা থাকে, আবার কখনো পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে কোনো কোনো ভাস্কর্যে মানুষের অবয়ব দেখা গেলেও তা সরাসরি মানবদেহের অনুকরণ নয়। বরং পরিচিত রূপের ভেতর দিয়ে শিল্পী একটি অনির্দিষ্ট অনুভূতি প্রকাশের চেষ্টা করেছেন।

প্রদর্শনীর ভাস্কর্যগুলোর প্রধান উপকরণ ইস্পাত। ইস্পাতের পাত, দণ্ড ও তার ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন অবয়ব। কোথাও ছাগলের মতো প্রাণীর আকৃতি, কোথাও দীর্ঘ মানবদেহ, কোথাও সংগীতশিল্পীর অবয়ব। আবার কিছু কাজে মুখমণ্ডল ও শরীরের গঠন ভেঙে গিয়ে বিমূর্ত রূপ নিয়েছে।

এই কাজগুলোর পৃষ্ঠতলও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কাটার দাগ, বাঁকানোর চিহ্ন এবং নির্মাণের অন্যান্য চিহ্ন অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট রাখা হয়েছে। শিল্পী এসব চিহ্ন ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। ফলে ইস্পাতের কঠিন ও রুক্ষ চরিত্রই ভাস্কর্যের প্রকাশভঙ্গির অংশ হয়ে উঠেছে।

আলো পড়লে ভাস্কর্যগুলোর পৃষ্ঠে তৈরি হয় ভিন্ন মাত্রার ছায়া। একই কাজ দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে দৃশ্যমান হতে পারে। কোথাও একটি মুখের মতো আকৃতি স্পষ্ট হয়। আবার কিছুটা দূরে সরে গেলে সেটিই হয়ে ওঠে একটি অনির্দিষ্ট জৈব গঠন। এই পরিবর্তন দর্শকের দেখার অভিজ্ঞতাকে সক্রিয় করে।

প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কালি ও কয়লার আঁকা ছবি। এসব কাজে রেখা কোনো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে নেই। রেখা কখনো ছুটে গেছে, কখনো ঘন হয়েছে, আবার কোথাও একাধিক রেখা পরস্পরকে অতিক্রম করেছে। মানুষের শরীর, প্রাণীর অবয়ব এবং বিভিন্ন জৈব আকৃতি এসব রেখার মধ্যে একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে।

বিশেষ করে কয়েকটি ছবিতে মানব ও প্রাণীর শরীরের বিভিন্ন অংশের সংমিশ্রণ দেখা যায়। সেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট অবয়ব চিহ্নিত করা সহজ নয়। বরং রেখার ঘনত্ব, গতি ও সংঘাত থেকেই ছবির আবহ তৈরি হয়েছে।

তৌফিকুর রহমানের বক্তব্যে জানা যায়, তাঁর ভাস্কর্য ও আঁকা ছবি একই সৃজনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। পরিচিত রূপের ভেতরে অজানা কিছু খুঁজে পাওয়ার আগ্রহ থেকেই তাঁর কাজের সূচনা। তাঁর কাছে জানা ও অজানার মধ্যবর্তী এই অনুসন্ধানই সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

প্রদর্শনীর কাজগুলোতে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কও বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে। মানুষ ও প্রাণীর মিশ্র অবয়বগুলো মানুষের আদিম অস্তিত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। কোথাও ক্ষমতা ও সহিংসতার ইঙ্গিত রয়েছে। কোথাও রয়েছে অসহায়ত্ব ও অন্তর্গত অস্থিরতা। তবে শিল্পী এসব অনুভূতির নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দর্শকের ওপর চাপিয়ে দেননি।

এ কারণে ‘রেখা-রূপ-ভারসাম্য’কে কেবল ভাস্কর্যের প্রদর্শনী হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। এখানে রেখা থেকে রূপ এবং রূপ থেকে ত্রিমাত্রিক অবয়ব তৈরির একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া দেখা যায়। আঁকা ছবি ও ভাস্কর্য একে অন্যকে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি আলাদা অভিজ্ঞতাও তৈরি করে।

প্রদর্শনীর কাজগুলো সহজে একটি নির্দিষ্ট অর্থে আবদ্ধ হয় না। কিছু কাজ প্রথম দেখায় পরিচিত মনে হলেও কিছুক্ষণ দেখার পর সেই পরিচিতি ভেঙে যায়। আবার বিমূর্ত কোনো অবয়বের মধ্যেও দর্শক নিজের পরিচিত কোনো রূপ খুঁজে নিতে পারেন। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতাই প্রদর্শনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তৌফিকুর রহমানের পঞ্চম একক প্রদর্শনী তাই তাঁর দীর্ঘ শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে সামনে আনে। মৃদু ইস্পাতের কঠিনতা, কালি ও কয়লার রেখার স্বাধীনতা এবং পরিচিত রূপের ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের শিল্পভাষাকে আরও বিস্তৃত করেছেন। ‘রেখা-রূপ-ভারসাম্য’ সেই অনুসন্ধানেরই একটি দৃশ্যমান প্রকাশ।

 

আরও পড়ুন: কংক্রিটের শহরে শরতের খোঁজ

One thought on “ইস্পাত আর রেখায় অজানা রূপের সন্ধানে তৌফিকুর রহমান”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *