কংক্রিটের নগরজীবনে শরতের সৌন্দর্যকে কীভাবে দেখা যায়, সেই প্রশ্নকে সামনে রেখে ঢাকায় শুরু হয়েছে দলীয় শিল্পপ্রদর্শনী ‘শহরে শরৎ’। ফ্লেম আর্টস ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় দলীয় এই প্রদর্শনীতে ২৩ জন শিল্পীর ৩৫টির বেশি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে।
লালমাটিয়ার গ্যালারি দি ইলিউশনসে আয়োজিত প্রদর্শনীটি ২৫শে সেপ্টেম্বর থেকে ১লা অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। প্রদর্শনীটির কিউরেটর মোঃ রাশেদ কামাল।
শরৎ সাধারণত নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল ও প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নগরজীবনে সেই পরিচিত শরৎ অনেকটাই ভিন্ন। যানজট, ভবন, কংক্রিট, ব্যস্ততা ও কৃত্রিম আলোর মধ্যে প্রকৃতির উপস্থিতি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যায় প্রদর্শনীর বিভিন্ন কাজে।
প্রদর্শনীতে শিল্পীদের কাজের বিষয় ও প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্য। কোথাও নারী ও প্রকৃতির সম্পর্ক উঠে এসেছে। কোথাও নগরজীবনের ব্যস্ততা ও বিচ্ছিন্নতা। আবার কোনো কোনো কাজে গ্রামীণ প্রকৃতি, পৌরাণিক অনুষঙ্গ কিংবা বিমূর্ত ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে।
নারী ও প্রকৃতির সম্পর্ক প্রদর্শনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শবনম চৌধুরী শাম্মীর কবুতর কোলে নেওয়া নারী, রানিয়া আলমের পাখি ও ফুলের সঙ্গে নারীর মিথস্ক্রিয়া এবং নাফিস আহমেদের ফুলের স্থিরচিত্রধর্মী কাজের মধ্যে প্রকৃতি ও মানবিক অনুভূতির সংযোগ দেখা যায়। তবে এসব কাজে নারীকে অনেক ক্ষেত্রে নীরব ও প্রকৃতিনির্ভর চরিত্র হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতাও রয়েছে।
নগর ও গ্রামের পার্থক্যও কয়েকটি কাজে স্পষ্ট। অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদের মেঘ ও শহরের ওপর ভাসমান নীল মুখাবয়ব নগরজীবনকে ভিন্ন এক দৃষ্টিতে দেখেছে। আশরাফুল কবির কনকের ঢাকার রাস্তার দৃশ্যে নগরের কোলাহল ও গতিশীলতা ফুটে উঠেছে। রোকসানা মহসিন সুমির নগরচিত্রেও শহরের নিজস্ব আবহ ধরা পড়েছে।
অন্যদিকে মোস্তাফিজুর রহমান মৃদুলের গ্রামীণ দৃশ্য ও আদিবাসী নারীর চিত্রে শহরের বাইরে থাকা প্রকৃতি ও মানুষের জীবন উঠে এসেছে। ফলে প্রদর্শনীতে নগরের যান্ত্রিকতা এবং গ্রামের তুলনামূলক সরল পরিবেশের মধ্যে একটি পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
কিছু শিল্পী প্রচলিত দৃশ্য উপস্থাপনার বাইরে গিয়ে বিমূর্ত ও পরীক্ষামূলক ভাষা ব্যবহার করেছেন। নিলয় আই এইচের কালো বিড়াল ও দেবীমূর্তির কাজে পৌরাণিক ভাবনার সঙ্গে সমকালীন জীবনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অনন্দিতা দত্তের বিমূর্ত ভূদৃশ্য এবং শিবানন্দ অধিকারী বিপ্লবের জ্যামিতিক নগরচিত্রেও প্রচলিত বাস্তবতার বদলে শিল্পীর নিজস্ব নির্মাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রদর্শনীতে রয়েছে বৈচিত্র্য। জলরঙের পাশাপাশি তেলরং, অ্যাক্রিলিক, ছাপচিত্র, মিশ্রমাধ্যম, বস্ত্রশিল্প, ভাস্কর্য ও স্থাপনাশিল্পের কাজ রয়েছে। শরতের কোমলতা প্রকাশে জলরঙের ব্যবহার যেমন দেখা যায়, তেমনি গাঢ় রং ও ঘন বিন্যাসে নগরের চাপ ও জটিলতাকেও প্রকাশ করা হয়েছে।
শুকনো ঘাস ব্যবহার করে তৈরি কাজ, মেঝেতে পশম ও লাল কাপড়ের ব্যবহার এবং দেয়ালে প্রদর্শিত সাদা ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। মুকুট পরা মানুষের ভাস্কর্য ও উড়ন্ত চক্রযানের চিত্র নিয়ে তৈরি স্থাপনাটিও দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। নগরজীবনের অস্বাভাবিকতা ও মানুষের অবস্থান নিয়ে কাজটি ভাবনার সুযোগ তৈরি করে।
নীল রঙের টেক্সটাইল আর্টও প্রদর্শনীতে একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। সাদিয়া হোসেন এথারের এই কাজ উপকরণের ভিন্ন ব্যবহারের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তবে প্রদর্শনীতে সব কাজের মান এক নয়। কিছু কাজ বিষয় ও নির্মাণের দিক থেকে শক্তিশালী হলেও কয়েকটি ফুলের চিত্র তুলনামূলকভাবে অলংকারনির্ভর মনে হতে পারে। এসব কাজে বিষয়গত গভীরতার চেয়ে দৃশ্যগত সৌন্দর্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
কাজ সাজানোর ক্ষেত্রেও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। প্রকৃতি ও নগরজীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি কাজের পাশাপাশি ভিন্ন ধরনের বিমূর্ত কাজ রাখায় কোথাও কোথাও বিষয়গত সংযোগ দুর্বল হয়েছে। আরও সুস্পষ্ট বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস থাকলে প্রদর্শনীর সামগ্রিক বক্তব্য দর্শকের কাছে আরও সহজে পৌঁছাতে পারত। একই সঙ্গে কিছু গাঢ় রঙের কাজের ক্ষেত্রে লাইটিং আরও পরিকল্পিত হলে সূক্ষ্ম বিবরণগুলো ভালোভাবে দেখা সম্ভব হতো।
তারপরও ‘শহরে শরৎ’ প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ এর বৈচিত্র্য। ২৩ জন শিল্পী একই বিষয়কে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও শিল্পভাষায় দেখেছেন। ফলে শরৎ এখানে শুধু ঋতুর দৃশ্য নয়। এটি হয়ে উঠেছে নগরজীবন, প্রকৃতি, মানুষ, স্মৃতি ও ব্যক্তিগত অনুভূতির একটি মিলিত ক্ষেত্র।
ফ্লেম আর্টস ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় দলীয় প্রদর্শনী হিসেবে ‘শহরে শরৎ’ সমকালীন শিল্পচর্চার নানা প্রবণতাকে একই পরিসরে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রদর্শনীর কাজগুলো একদিকে শহরের ব্যস্ততা ও বিচ্ছিন্নতার কথা বলে। অন্যদিকে কংক্রিটের মধ্যেও প্রকৃতির উপস্থিতি এবং মানুষের সেই উপস্থিতির প্রতি আকর্ষণকে সামনে আনে। শরৎ তাই এখানে শুধু ঋতু নয়। শহরের ভেতরে প্রকৃতিকে নতুন করে দেখার একটি উপলক্ষও।
সামগ্রিকভাবে, এই প্রদর্শনীটি নগরজীবনের শরৎকে বহুমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করেছে এবং দর্শককে ভাবতে বাধ্য করেছে—কংক্রিটের শহরেও প্রকৃতি কিভাবে তার উপস্থিতি টিকিয়ে রাখে। ফ্লেম আর্টস ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ সমকালীন শিল্পচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করা যায়।