কার্ডিফে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সমঝোতায় যুক্ত হয়েছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাপন্থী জাতীয়তাবাদী দলগুলো। সোমবারের (১৪ই সেপ্টেম্বরের) বৈঠকে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি), প্লাইড কিমরু ও সিন ফেইনের নেতারা যুক্তরাজ্যের সরকারের প্রতি নিজ নিজ অঞ্চলের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কার্ডিফে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্কটল্যান্ডের নেতা জন সোয়েনি, ওয়েলসের নেতা রুন অ্যাপ ইওয়ের্থ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতা মিশেল ও’নিলের সঙ্গে ছিলেন সিন ফেইনের সভাপতি মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড। নেতারা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, নিজ নিজ দলের নেতা হিসেবে বৈঠকে অংশ নেন।
যৌথ ঘোষণায় তারা বলেন, ‘ওয়েস্টমিনস্টারের সময় শেষ হয়ে আসছে।’ একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারকে ‘সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে সহায়তা’ করার আহ্বান জানানো হয়। ঘোষণায় বলা হয়, তিন জাতির জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্যে নিহিত।
২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট হয়েছিল। তখন স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট পড়ে ৫৫ শতাংশের কিছু বেশি, আর পক্ষে ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ। ব্রেক্সিটের পর স্কটল্যান্ডে আবার স্বাধীনতার দাবি জোরালো হয়, কারণ ২০১৬ সালের গণভোটে স্কটল্যান্ডের ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
বর্তমানে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা জন সোয়েনি স্বাধীনতার পক্ষে নতুন গণভোটের দাবি করছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোয়েনি ২০৩১ সালের মধ্যে একটি গণভোট আয়োজনের কথা বলেছেন। তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সম্প্রতি জানিয়েছেন, নতুন স্বাধীনতা গণভোটের বিষয়টি তাঁর সরকারের কাছে ‘আলোচনার বাইরে’।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার প্রশ্নটি স্কটল্যান্ড বা ওয়েলসের মতো নয়। এখানে মূল সাংবিধানিক বিতর্ক হলো যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে থাকা নাকি আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে পুনর্মিলন।
সিন ফেইন দীর্ঘদিন ধরে আইরিশ পুনর্মিলনের পক্ষে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আয়ারল্যান্ড পুনর্মিলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর মন্তব্যের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান হলো, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রশ্নে গণভোটের বিষয়টি নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট আইন ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে।
ওয়েলসের ক্ষমতাসীন প্লাইড কিমরুও স্বাধীনতার পক্ষে। তবে স্কটল্যান্ডের মতো দ্রুত স্বাধীনতার গণভোট আয়োজনের দাবি ওয়েলসের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দু নয়।
কার্ডিফের বৈঠকের আগে ও পরে ওয়েলসের নেতা রুন অ্যাপ ইওয়ের্থ ওয়েলসের জন্য আরও ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। ফলে তিন দলের যৌথ ঘোষণায় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের কথা থাকলেও তিন দেশের রাজনৈতিক পথ একই নয়।
এই সমঝোতার রাজনৈতিক গুরুত্বের একটি কারণ হলো, যুক্তরাজ্যের তিনটি ডিভলভড নেশন—স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে বর্তমানে স্বাধীনতা বা সাংবিধানিক বিচ্ছিন্নতার পক্ষে থাকা দলগুলোর নেতৃত্ব রয়েছে। যৌথ ঘোষণাতেও বিষয়টিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এই জোটকে সরাসরি তিনটি দেশের স্বাধীনতার জন্য আনুষ্ঠানিক সরকারি জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নেতারা বৈঠকে দলীয় নেতা হিসেবে অংশ নিয়েছেন এবং প্রতিটি দেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ আলাদাভাবে নির্ধারিত হবে—এ কথাও যৌথ ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম একদিকে আঞ্চলিক পর্যায়ে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের নতুন স্বাধীনতা গণভোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। জুলাইয়ে জন সোয়েনির সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, আরেকটি স্বাধীনতা গণভোটের বিষয়টি তাঁর সরকারের কাছে ‘অফ লিমিটস’।
কার্ডিফের সমঝোতা সেই অবস্থানের ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। তবে এটি যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার কোনো তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে—এমন দাবি করার মতো তথ্য এখনো নেই। বরং এটি স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের দাবিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
কার্ডিফের বৈঠকের পাশাপাশি স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের সরকার পৃথকভাবে ‘কার্ডিফ অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে সহযোগিতার একটি চুক্তিও করেছে। এতে দারিদ্র্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
ফলে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই; তা দেশটির ক্ষমতা বণ্টন, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাংবিধানিক কাঠামো নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে।