ডাঃ মআআ মুক্তাদীর
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক জাতীয় পতাকার রং লাল ও সবুজ। এই দুই রঙের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবে লাল-সবুজকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রূপে পাওয়ার ইতিহাস ১৯৭১-৭২ সালের। এর অনেক আগে, ১৯৪৭ সালে ভাষার অধিকার নিয়ে প্রকাশিত একটি ঐতিহাসিক পুস্তিকার প্রচ্ছদে লাল-সবুজের ব্যবহার দেখা যায়। সেই পুস্তিকার নাম—‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—না উর্দু?’।
পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৭। অর্থাৎ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র এক মাসের মধ্যে। তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে প্রকাশিত এই পুস্তিকা বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সামনে আনে। একই সঙ্গে পূর্ব বাংলায় শিক্ষা, আদালত ও প্রশাসনের ভাষা হিসেবে বাংলার প্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে।
এ কারণে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে পুস্তিকাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক একে ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক ইশতেহার বা প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচনা করেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি সামনে আসে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগের বিপরীতে পূর্ব বাংলায় বাংলার মর্যাদা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
এই পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিশ গঠিত হয়। সংগঠনটি বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৫ই সেপ্টেম্বর তারা প্রকাশ করে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—না উর্দু?’।
পুস্তিকাটিতে ছিল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা। এগুলো লিখেছিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম, ড. কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবুল মনসুর আহমদ। আবুল কাশেমের প্রস্তাবনায় পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম, আদালতের ভাষা ও অফিসের ভাষা করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা হিসেবে বাংলা ও উর্দুর কথা বলা হয়েছিল।
অর্থাৎ দাবিটি শুধু আবেগের জায়গা থেকে উত্থাপিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রশাসন, শিক্ষা ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি সুস্পষ্ট ভাষানীতি।
পুস্তিকাটি ছিল ছোট আকারের। প্রচ্ছদসহ মোট ১৮ পৃষ্ঠার। ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর এটি প্রকাশিত হয়।
এর গুরুত্ব ছিল দুটি জায়গায়।
প্রথমত, বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিকে এটি সুসংগঠিত যুক্তির মাধ্যমে সামনে আনে।
দ্বিতীয়ত, ভাষার দাবিকে শিক্ষা ও প্রশাসনের বাস্তব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে।
এ কারণে পুস্তিকাটি প্রকাশের পর ভাষার প্রশ্নটি আর শুধু সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে তা রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নেয়।
এর পরের কয়েক মাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ সভাও অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক আবুল কাশেম সেখানে সভাপতিত্ব করেন।
১৯৪৭ সালের এই উদ্যোগের পর ভাষার প্রশ্ন দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালে আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটায়। ২১শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। ভাষার অধিকার তখন বাঙালির রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।
পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য কেবল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভাষার অধিকারকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক আত্মপরিচয় তৈরি হয়েছিল, সেটিই পরবর্তী স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—না উর্দু?’ পুস্তিকার প্রচ্ছদে লাল ও সবুজের ব্যবহার আজকের বাংলাদেশের পাঠকের কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে ইতিহাসের বিচারে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি।
১৯৪৭ সালের ওই পুস্তিকার প্রচ্ছদের লাল-সবুজকে সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার পূর্বনকশা বা পতাকার রং নির্ধারণের উৎস বলা যায়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতার পতাকা তৈরি হয় ১৯৭১ সালে। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো যে পতাকা উত্তোলন করা হয়, সেটিতে সবুজ জমিনের ওপর লাল বৃত্তের মধ্যে সোনালি রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র ছিল। স্বাধীনতার পর মানচিত্র বাদ দিয়ে বর্তমান পতাকার রূপ নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান জাতীয় পতাকা সরকারিভাবে গৃহীত হয় ১৭ই জানুয়ারি ১৯৭২।
তাই ১৯৪৭ সালের পুস্তিকার প্রচ্ছদকে জাতীয় পতাকার সরাসরি উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে এটা বলা বেশি যুক্তিসংগত যে, লাল-সবুজের এই পুরোনো ব্যবহার পরবর্তী বাংলাদেশের প্রতীকী ইতিহাসের সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক সমান্তরালতা তৈরি করে।
‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—না উর্দু?’ শুধু একটি বই বা পুস্তিকা নয়। এটি পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে প্রকাশিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল। পুস্তিকাটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সময়কাল। পাকিস্তান রাষ্ট্র তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্রের চরিত্র ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তখনও নানা প্রত্যাশা ছিল। সেই সময়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল—এই রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষার মর্যাদা কী হবে?
প্রশ্নটি ছিল সরল। কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল গভীর। কারণ ভাষার অধিকার মানে শুধু কথা বলার অধিকার নয়। শিক্ষা কোন ভাষায় হবে, আদালতে কোন ভাষা ব্যবহৃত হবে, সরকারি দপ্তরে কোন ভাষা চলবে এবং রাষ্ট্র তার নাগরিককে কোন ভাষায় স্বীকৃতি দেবে—এসব প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এই জায়গাতেই পুস্তিকাটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশে বহু গবেষণা হয়েছে। তবু ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—না উর্দু?’ পুস্তিকাটিকে আলাদা করে বিশ্লেষণের সুযোগ এখনও রয়েছে। এর প্রকাশনার প্রেক্ষাপট, লেখকদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান, পুস্তিকার ভাষা ও যুক্তি, তৎকালীন পাঠকের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব—এসব বিষয়ে আরও গবেষণা হতে পারে।
বিশেষ করে পুস্তিকাটির মূল সংস্করণ, প্রচ্ছদ, প্রকাশনা-সংক্রান্ত তথ্য এবং পরবর্তী সংস্করণগুলো পাশাপাশি পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের অন্যান্য প্রাথমিক দলিলের সঙ্গে এর বক্তব্য তুলনা করা দরকার। কারণ ইতিহাসের বড় পরিবর্তন অনেক সময় বড় কোনো ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো তার শুরু হয় একটি ছোট পুস্তিকা থেকে।
১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা—না উর্দু?’ তেমনই একটি দলিল। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঘোষণা করেনি। কিন্তু বাংলা ভাষার অধিকারকে রাষ্ট্রের প্রশ্নে পরিণত করার যে প্রাথমিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংগঠনিক প্রয়াস শুরু হয়েছিল, তার ইতিহাসে পুস্তিকাটির স্থান অনস্বীকার্য।
আর সেই অর্থে, পুস্তিকাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অনেক দূরের শুরু খুঁজতে গেলে ১৯৭১-এ থেমে থাকা যায় না। ফিরে যেতে হয় ১৯৪৭-এর সেই প্রশ্নের কাছে: রাষ্ট্র কার, আর সেই রাষ্ট্রের ভাষা কার?