সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে ১১ কোটি টন ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ কাঁচামালের সন্ধান পাওয়া গেছে। সোমবার (১৪ই সেপ্টেম্বর) ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাধারণ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান। সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে খবরটি প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
নতুন এই আবিষ্কার সৌদি আরবের পরমাণু জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নতুন গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মদিনার জাবাল সায়েদ অঞ্চলের বিরল মাটি বা রেয়ার আর্থ সম্পদ নিয়ে আগে থেকে আলোচনায় থাকা তথ্যকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে ১১ কোটি টন কাঁচামাল মানেই ১১ কোটি টন ইউরেনিয়াম নয়। এটি ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ আকরিক বা কাঁচামালের মোট পরিমাণ। আকরিক থেকে প্রকৃতপক্ষে কত ইউরেনিয়াম বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা যাবে, তা নির্ভর করবে এর ঘনত্ব, উত্তোলন প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ার ওপর।
মদিনা অঞ্চলের জাবাল সায়েদ ইতোমধ্যেই সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেয়ার আর্থ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সৌদি শিল্প ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে, জাবাল সায়েদে আনুমানিক ৫ লাখ ৫২ হাজার টন হেভি রেয়ার আর্থ উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়াম রয়েছে।
এ ছাড়া সেখানে প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার টন লাইট রেয়ার আর্থ উপাদান থাকার হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে নিওডিমিয়াম ও প্র্যাসিওডিমিয়াম রয়েছে। সিএসআইএস-এর মূল্যায়নে জাবাল সায়েদ বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান রেয়ার আর্থ মজুতগুলোর একটি।
জাবাল সায়েদে প্রায় ৩১ হাজার টন ইউরেনিয়ামের সম্পদ থাকার তথ্যও আগে থেকেই বিভিন্ন বিশ্লেষণে এসেছে। তবে এই সংখ্যাকে আজকের ১১ কোটি টন নতুন আবিষ্কারের সরাসরি সমার্থক হিসেবে দেখা যাবে না। নতুন ঘোষণায় সৌদি সরকার মূলত ১১ কোটি টন ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ কাঁচামালের কথা জানিয়েছে।
রেয়ার আর্থ বলতে একগুচ্ছ ধাতব উপাদানকে বোঝানো হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে এগুলোর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়াম উচ্চক্ষমতার স্থায়ী চুম্বক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। নিওডিমিয়াম ও প্র্যাসিওডিমিয়ামও শক্তিশালী চুম্বকের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব চুম্বক বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন, শিল্পযন্ত্র এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।
সমস্যা হলো, শুধু খনি থাকলেই সরবরাহ নিশ্চিত হয় না। আকরিক উত্তোলনের পর সেটি আলাদা করা, পরিশোধন এবং প্রয়োজনীয় ধাতুতে রূপান্তরের জন্য জটিল শিল্প অবকাঠামো দরকার।
এই জায়গাতেই চীনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। রেয়ার আর্থের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাই চীনের বাইরে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সহযোগিতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২৫ সালের শেষ দিকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় খনিজ কোম্পানি মাদেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমপি ম্যাটেরিয়ালস এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর সৌদিতে রেয়ার আর্থ পরিশোধন ও পৃথকীকরণ অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। পরিকল্পনাটির লক্ষ্য সৌদি আরবকে কেবল কাঁচামাল উত্তোলনকারী দেশ হিসেবে না রেখে রেয়ার আর্থ সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরেনিয়াম।
গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার জন্য একটি সেকশন ১২৩ এগ্রিমেন্ট সই করে। মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার আইনি কাঠামো তৈরি করবে। এতে পারমাণবিক প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সরঞ্জাম বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চুক্তিটি সৌদি আরবের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ আকরিক পাওয়া গেলেই তা সরাসরি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা যায় না। আকরিক থেকে ইউরেনিয়াম বের করতে হয়। এরপর পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির জন্য আরও কয়েকটি ধাপ প্রয়োজন।
এ কারণে নতুন আবিষ্কারকে ভবিষ্যৎ পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এটি সৌদির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি নিশ্চিত হয়ে গেছে—এমন দাবি করার মতো পর্যায়ে এখনও পৌঁছায়নি।
রেয়ার আর্থের বাজারে চীনের প্রভাব কমানোর চেষ্টা এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
চীন গত কয়েক বছরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও রেয়ার আর্থের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ২০২৬ সালেও চীনা রেয়ার আর্থ সরবরাহ নিয়ে মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের গুরুত্ব শুধু মাটির নিচে থাকা সম্পদের কারণে নয়। দেশটি যদি খনি, পরিশোধন, পৃথকীকরণ এবং চুম্বক উৎপাদনের মতো পরবর্তী ধাপগুলোও গড়ে তুলতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিকল্প রেয়ার আর্থ সরবরাহকেন্দ্র তৈরি হতে পারে।
এখানে সৌদির ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে দেশটির অবস্থান এবং বন্দর অবকাঠামো ভবিষ্যৎ রপ্তানি ব্যবস্থায় সুবিধা দিতে পারে।
সৌদি আরবের এই উদ্যোগকে দেশটির ভিশন ২০৩০-এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবেও দেখা যায়। লক্ষ্য শুধু তেল বিক্রি করে আয় করা নয়। খনিজ, শিল্প, প্রযুক্তি এবং জ্বালানি খাতে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করাও এর অংশ।
তবে খনিজ সম্পদের বড় হিসাব আর বাস্তব বাণিজ্যিক উৎপাদন এক বিষয় নয়। খনি উন্নয়ন করতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। পরিবেশগত অনুমোদন, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবলও দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, উত্তোলন করা আকরিক থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে প্রয়োজনীয় ধাতু উৎপাদন করা যায় কি না। তাই মদিনার ১১ কোটি টন ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ কাঁচামালের ঘোষণাকে এখনই সৌদি আরবের নতুন ‘ইউরেনিয়াম শক্তি’ হয়ে ওঠার প্রমাণ বলা যাবে না।
কিন্তু রেয়ার আর্থ সম্পদ, ইউরেনিয়াম এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক ও খনিজ সহযোগিতা—এই তিনটি প্রবণতা একই সময়ে এগোতে থাকায় সৌদি আরবের কৌশলগত গুরুত্ব যে বদলাচ্ছে, সেটি স্পষ্ট।
তেলের পর সৌদি আরব কি ইউরেনিয়াম ও রেয়ার আর্থের ভূরাজনীতিতেও বড় খেলোয়াড় হবে—এর উত্তর এখনই দেওয়া কঠিন। তবে মদিনার মাটির নিচের সম্পদ সেই সম্ভাবনাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব করে তুলেছে।